সুদ হালাল না হারাম?
****************
আমাদের দেশে ওয়াজ করা হুজুররা দুর্নীতি, ঘুষ,ধর্ষণ ইত্যাদির চেয়ে সুদ নিয়েই কথা বেশি বলেন।
দেখি সুদ সম্পর্কে ইসলাম কি বলেছে।
কুরআনে সুদকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং এর ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়েছে, যেমন সূরা বাকারার ২৭৫-২৭৯ আয়াতে সুদখোরদের শয়তান-তাড়ানো পাগলের সাথে তুলনা করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে আল্লাহ ব্যবসা হালাল করেছেন কিন্তু সুদ হারাম করেছেন; একইসাথে, সূরা আলে-ইমরানের ১৩০ আয়াতে চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ খাওয়া থেকে বিরত থাকতে এবং সূরা আর-রুমের ৩৯ আয়াতে সুদের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি আল্লাহর কাছে বাড়ে না বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা সুদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা ও এর বিরুদ্ধে আল্লাহর যুদ্ধ ঘোষণার (সূরা বাকারার ২৮০) ইঙ্গিত দেয়।
সুদ সম্পর্কিত কিছু গুরুত্বপূর্ণ কুরআনের আয়াত:
সূরা আল-বাকারাহ (২:২৭৫): "যারা সুদ খায়, তারা (কিয়ামতের দিন) এমনভাবে দাঁড়াবে, যেন শয়তান তাদের স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে। এটা এ কারণে যে, তারা বলে: কেনাবেচা তো সুদেরই মতো। অথচ আল্লাহ কেনাবেচাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।"
সূরা আল-বাকারাহ (২:২৭৬): "আল্লাহ সুদকে ধ্বংস করে দেন এবং দানকে বৃদ্ধি করেন। আর আল্লাহ কোনো অপকারী বা অকৃতজ্ঞকে ভালোবাসেন না।"
সূরা আল-বাকারাহ (২:২৭৮): "হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং যদি তোমরা মুমিন হও তবে সুদের যা অবশিষ্ট আছে তা ছেড়ে দাও।"
সূরা আল-বাকারাহ (২:২৭৯): "আর যদি তোমরা তা না করো, তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকো। আর যদি তোমরা তওবা করো, তাহলে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই থাকবে, এতে তোমরা জুলুম করবে না এবং তোমাদের ওপরও জুলুম করা হবে না।"
সূরা আলে-ইমরান (৩:১৩০): "হে মুমিনগণ! তোমরা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ খেয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।"
সূরা আর-রুম (৩০:৩৯): "আর তোমরা যে সুদ দিয়ে থাকো, যাতে মানুষের সম্পদের সাথে মিশে তা বেড়ে যায়, তা আল্লাহর কাছে বাড়ে না। আর তোমরা যে যাকাত বা দান দিয়ে থাকো, যা তোমরা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে দিয়ে থাকো, তা বহুগুণে বৃদ্ধি পায় এবং তারাই দ্বিগুণ-বহুগুণে লাভবান হয়।"
এই আয়াতগুলো সুস্পষ্টভাবে সুদের লেনদেনকে হারাম ঘোষণা করে এবং এর মাধ্যমে অর্জিত সম্পদকে বরকতহীন বলে উল্লেখ করে, যা মুমিনদেরকে সুদ থেকে দূরে থাকতে এবং দান-সদকার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নির্দেশ দেয়।
কয়েক বছর আগে বেনজির ভুট্টোর
Reconciliation : Islam Democracy and the West.
( রেকনসিলেশন : ইসলাম গনতন্ত্র ও পশ্চিমা বিশ্ব)
বইটি পড়েছিলাম। ওই বইতে তিনি কোরানের কিছু আয়াত ও সূরা সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, কিছু আয়াত ও সূরা নাজিল হয়েছিলো ওই সময়ে আরব দেশের প্রেক্ষাপটে। যা বর্তমানে প্রযোজ্য নয়।
সুদ নিয়ে আমার নিজস্ব কিছু চিন্তা ভাবনা আছে। ওই সময় অর্থাৎ ১৪শ বছর আগে পৃথিবীতে আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা ছিলো না। ব্যাংক থাকার তো প্রশ্নই উঠে না। তাহলে কোরান উল্লেখিত এই সুদ ব্যক্তি কেন্দ্রিক। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি কাউকে টাকা দিলেন এবং সেই টাকার বিনিময়ে তিনি সুদ নিলেন। সেটা হারাম।
গিয়াস উদ্দিন তাহেরীর ওয়াজ মাহফিল আমি দেখি না। কারণ সে ওয়াজ করার সময় স্টেজে মৃগী রোগীর মতো লাফায়। তবে ফেসবুক সয়লাব তার ব্যাংকে রাখা টাকার আমানতের সুদ নিয়ে। নির্বাচন কমিশনে তার হলফনামা প্রকাশের পর। তিনি হবিগঞ্জ থেকে এমপি প্রার্থী।
ইসলামের কিছু বিধিনিষেধ নতুন করে চিন্তা ভাবনার অবকাশ আছে। ১৪শ বছর আগে পৃথিবীতে কিছুই ছিলো না। আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা তো নয়ই। আর্মি, পুলিশ, নৌ বাহিনী, বিমান বাহিনী কিছুই ছিলো না। ব্যাংক তো নয়ই। গাড়ি, বিমান ছিলো না। বিদ্যুৎ ছিলো না। সন্ধ্যা হলেই খেয়েদেয়ে সবাই ঘুমিয়ে পড়তো।
৫০/৫৫ বছর আগে বরুরা থানার মহেশপুর গ্রামে বেড়াতে যেতাম মাঝে মাঝে। তখন স্কুলে পড়তাম।আমার সেজো বোনকে বিয়ে দেয়া হয়েছিলো মহেশপুর। সেখানেই দেখেছি, মাগরিবের পর খেয়েদেয়ে ৮ টার মধ্যেই সবাই ঘুমিয়ে যেতো। ৮ টায় ঘুমালে ভোর ৪ টায় উঠা কোনো ব্যাপার না। ৮ ঘন্টা ঘুম। পর্যাপ্ত। তখন বিদ্যুৎ ছিলো না। এখন আমরা ঘুমাই ১২/১ টায়। ১৪শ বছর আগের সৌদি আরবকে একটু কল্পনা করুন তো চোখ বন্ধ করে।
সুদকে আমি হারাম মনে করি না। যাদের লাখ লাখ, কোটি কোটি টাকা আছে তারা সবাই সুদ খায়। আমি ব্যাংকে টাকা রাখবো। এই টাকা ব্যাংক কোনো এক ব্যবসায়ীকে দেবে। সে এই টাকা দিয়ে ব্যবসা করবে এবং ব্যাংককে একটা লাভ দেবে। ব্যাংক সেই লাভ থেকে আমাকে একটা লাভ দেবে। দুনিয়ার ব্যাংক ব্যবস্থা চলছেই এভাবে। ইসলামী ব্যাংকও সুদ দেয়, নেয়। তাছাড়া ব্যাংকে চাকরি করে যারা জীবন যাপন করে তদের বেতনের টাকাটাও সুদ থেকে আসে।
বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, সব ব্যাংকই বিভিন্ন সরকারকে লোন দেয় সুদের উপর। আরও কিছু সংস্থা যেমন জাইকাও বিভিন্ন গরীব দেশের উন্নয়ন কাঠামোর জন্য সুদের বিনিময়ে টাকা দেয়। আবার কোনো রাষ্ট্রও অন্য রাষ্ট্রকে সুদের বিনিময়ে টাকা দেয়। আমরা সেই রাষ্ট্র ব্যবস্থার অধীনে জীবন যাপন করি।
২০২৪ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ প্রায় ১১০ থেকে ১১৩ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ছিল, যা প্রায় ১৩ থেকে ১৪ লাখ কোটি টাকা, এবং এটি ক্রমাগত বাড়ছে; বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৪ শেষে তা ১০৪.৪৮ বিলিয়ন ডলার ছিল, যা আগের ৫ বছরে ৪২% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঋণের মধ্যে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাত অন্তর্ভুক্ত এবং এটি দেশের জিডিপির অনুপাতে উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে মাথাপিছু বিদেশি ঋণ ৬০৫ ডলারে পৌঁছেছে (২০২৩-২৪ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী)। ৬০৫ ডলারে বাংলাদেশি টাকায় মাথাপিছু সুদ ৭৩,৮১০ টাকা। যা আপনি আমি পরিশোধ করতেছি। তাহলে সুদ নিয়ে এতো কথা কেনো? যে সব হুজুররা সুদের ওয়াজ করেন তারাও এই সুদ পরিশোধ করতেছেন।
সুদের অনেক উপকারীতা আছে। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক বেশ গরীব ছিলেন। নুন আনতে পান্তা ফুরায়। আমি গোপনে অনেক সাহায্য সহযোগিতা করেছি। ৮/১০ বছর আগে তিনি কোনো এক ব্যক্তির ( আমি চিনি) নিকট থেকে সুদের উপর কয়েক লাখ টাকা নিয়ে তার ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়ে দেন। এখন তিনি বেশ স্বচ্ছল। সুদের টাকা পরিশোধ করেও বাড়িতে তিন তলা বাড়ি করেছেন। এটা সুদের উপকারীতা।
মানুষ একটা বাড়ি করতে গেলেও ব্যাংক থেকে সুদের উপর লোন নেন। গাড়ি কিনতেও সুদের উপর লোন নেন।
সুদ যদি এতোই হারাম হয় তাহলে সুদের টাকায় বানানো রাস্তাঘাটে গাড়ি চালানো ও মেট্রোরেলে চড়াও হারাম। সুদের টাকায় বানানো ব্রিজের উপর দিয়ে দামী গাড়ি নিয়ে চলাও হারাম।।
এসব এখন আর লিখি না। এই দেশের মানুষ তো। নাস্তিক টাস্তিক বলে ফেলবে। অথচ নিজেরা নাস্তিকের চেয়েও খারাপ।১
৫ জানুয়ারি ২০২৬
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন