ইরান, ইসরাইল,আমেরিকা যুদ্ধ এবং সুন্নি ও শিয়া
---------------------------------------------------
অনেকদিন ধরেই ফেইসবুকে বড় কোনো লেখা লিখিনা। আজ না লিখে থাকতে পারলাম না। এই লেখা মূলত একাডেমিক আলোচনা। এখানে কাউকে হার্ট করার জন্য লেখা হয়নি। আমার আশেপাশে অনেকেই আছেন বিভিন্ন তরিকার। কেউ তাবলীগ জামাত করেন। কেউ আহলে হাদিস করেন। কেউ রেজভীয়া গ্রুপ করেন। কেউবা দেওয়ানবাগ হুজুরের অনুসারী। প্রায় সকলের সঙ্গেই আমার বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক আছে। গ্র্যাজুয়েশন লেভেলে আমার ৩০০ নম্বরের ইসলামের ইতিহাস ছিল। তখন ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন যুদ্ধের কাহিনী পড়ে নিজের মনে খটকা লাগতো। হযরত আলীর সাথে হযরত আয়েশার যুদ্ধ। যা ইসলামের ইতিহাসে উষ্ট্রের যুদ্ধ নামে পরিচিত। ওই যুদ্ধে হযরত আয়েশা উঠে চড়ে এসেছিলেন বলে এই যুদ্ধের নামকরণ করা হয় উষ্ট্রের যুদ্ধ। আমি অবাক হয়ে ভাবতাম হযরত আলী নবীজির চাচাতো ভাই এবং মেয়ের জামাই আর হযরত আয়েশা নবীজির স্ত্রী তাদের মধ্যে যুদ্ধ হবে কেন? পরে যখনই সুযোগ পেয়েছি তখন ইসলামের ইতিহাস পড়ার চেষ্টা করেছি।
আমাদের উপমহাদেশে শিয়া সুন্নি বিষয়টি বেশি প্রকাশ্যে আসে পাকিস্তানে জেনারেল জিয়াউল হক ক্ষমতায় আসার পর। ১৯৭৯ সালের ৪ঠা এপ্রিল জুলফিকার আলী ভুট্টোকে ফাঁসি দেওয়ার পর জিয়াউল হক এই ধর্মীয় কার্ডটি খেলেন। আমাদের সিনিয়ররা আগে বায়োডাটাতে রিলিজিয়নের ঘরে লিখতেন, ধর্ম -ইসলাম। কিন্তু আশির দশক থেকে রিলিজিয়নের ঘরে ইসলাম লেখার পাশে ব্র্যাকেট দিয়ে সুন্নি লিখতাম আমরা। তখন সিভি বা রেজুমে বলা হতো না। বলা হতো বায়োডাটা।
জুলফিকার আলী ভুট্টো এবং তার ফ্যামিলি শিয়া মুসলমান ছিলেন। ভুট্টো বিয়েও করেছিলেন ইরানি সুন্দরী নুসরাতকে। পাকিস্তান পিপলস পার্টিকে শেষ করে দিতে জিয়াউল হক এই কার্ডটি খেলেছেন।
আমার পিতামাতা সুন্নি মুসলমান। আমিও। আমার পিতামাতার যোগ্যতা ছিল না একথা তলিয়ে দেখার জন্য যে, কেন তারা সুন্নি মুসলমান। রসূল (সা.) তো আমাদের মুসলমান হিসেবে রেখে গিয়েছিলেন। তাহলে আমরা সুন্নি হলাম কিভাবে? আমার পিতামাতা অল্পশিক্ষিত হলেও নিজের পিপাসা মেটানোর মতো শিক্ষা আমার আছে। আমি ইসলামের ইতিহাস পাঠ করে যা পেয়েছি, তাতে মনে হয়েছে সুন্নিরা ভুল পথে আছে। রসূল (সা.) ও রসূলের পরিবারের সঙ্গে প্রতিটি অন্যায় এবং গাদিরে খুমে হযরত আলীকে রসূলের উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা অস্বীকার করা হচ্ছে সুন্নিদের ধর্ম বিশ্বাস।
গাদির খুম (Ghadir Khumm) হলো মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী একটি স্থান, যেখানে ১০ হিজরির ১৮ই জিলহজ বিদায় হজ থেকে ফেরার পথে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেছিলেন এবং হযরত আলী (রা.)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।
কিন্তু গাদিরে খুমে কেউ তখন দ্বিমত করেননি। আবু বকর এবং ওমর হযরত আলীকে মুসলিম উম্মাহর পরবর্তী নেতা হিসেবে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন। অভিনন্দন জানিয়ে ছিলেন কি বুঝে? গাদিরে খুমের ভাষণের পর রসূল (সা:) ৮৩ দিন জীবিত ছিলেন। রসূলের জীবদ্দশায় পরবর্তী নেতা হিসেবে হযরত আলীর নিযুক্তি নিয়ে কারো মনে সন্দেহ দেখা দেয়নি। রসূলের মৃত্যুর সাথে সাথে তারা চোখ উল্টে ফেলেন। রসূলের দাফন কাফন ফেলে সাকিফা হাউজ-এ গিয়ে খলিফা হয়ে যান। কি বিচিত্র পৃথিবী!
এখন ইরান, আমেরিকা, ইসরাইল যুদ্ধ নিয়ে আমাদের দেশের একটি বিশেষ ইসলামী গ্রুপ ইরানি শিয়াদের কাফের বলে ফতোয়া দেয়া শুরু করেছে। নবীজীর মৃত্যুর পর ইসলাম ধর্মে অনেক গ্রুপ সৃষ্টি হয়। এখন আরও বেশি। কাদিয়ানী, আহমদীয়া, কুর্দি। আবার চার ইমামের চার মাযহাব। হানাফি, সাফি, মালিকি ও হানবালি। একটি ইসলামী গ্রুপ চার মাযহাবে নেই। তারা নিজেদের সালাফি পরিচয় দিতে পছন্দ করেন। বাংলাদেশে যারা আহলে হাদিস নামে পরিচিত। এই সালাফি গ্রুপ কিভাবে এলো তা আলোচনা করা যেতে পারে।
ইরানের প্রধান শত্রু দেশ সৌদি আরব। ওরা ওয়াহাবি মতাদর্শে বিশ্বাসী। এই ওয়াহাবিরাই আজকের সৌদি আরবের শাসন ক্ষমতায় এবং তারা বেশ প্রভাবশালী।
মুহাম্মদ ইবনে আবদ আল-ওয়াহাব (১৭০৩-১৭৯২) ছিলেন একজন আরব ধর্মীয় সংস্কারক ও পণ্ডিত, যিনি নজদ অঞ্চল থেকে ওয়াহাবি আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন।
ওয়াহাব আরব প্রধান ইবনে সৌদের সাথে হাত মিলান।এবং তারা দুজন মিলে আরব উপদ্বীপ দখল করে নেন। (যদিও এই অঞ্চল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিলো।) এবং আধুনিক সৌদি আরব প্রতিষ্ঠা করেন। সৌদের নামানুসারেই দেশের নামকরণ করা হয় সৌদি আরব। মানে সৌদের আরব। এবং রাজ্যের ইসলাম চর্চা শুরু হয় ওয়াহাবি মতাদর্শে। তারা মাজার পুজাসহ অনেক কিছু নিষিদ্ধ করেন।
এই ওয়াহাবি মতাদর্শের লেটেস্ট ভার্সন ই সালাফি। যারা এই দেশে আহলে হাদিস নামে পরিচিত। এই আহলে হাদিস মূলত সৌদি আরবের পারপাস সার্ভ করে। সৌদি আরব তাদের ফান্ডিং করে। এই গ্রুপের মাওলানারাই ইরানকে তথা শিয়াদের কাফের বলে। কাফের শব্দের অর্থ 'অস্বীকারকারী'। অথচ শিয়ারা আল্লাহকে মানে। নবীকে মানে। কোরানকে মানে। শিয়াদের কেবলাও মক্কা। শিয়ারা হজ্ব করে।
মূল পার্থক্য নবীর মৃত্যুর পর হজরত আলীর খলিফা হওয়ার কথা ছিলো। নবী হজরত আলীকে খলিফা মনোনীত করেছিলেন। যা সুন্নিরা অস্বীকার করে।
উল্লেখ্য যে, আবু বকরের মেয়ে আয়েশা ও ওমরের মেয়ে হাফজাকে নবী বিয়ে করেছিলেন। আবু বকর ও ওমর দুইজনই নবীর শ্বশুর।
এখান থেকেই শিয়া সম্প্রদায়ের সৃষ্টি। তারা আবু বকর ও ওমরকে খলিফা মানে না। এবং শিয়াদের বক্তব্য সঠিক বলে মনে করি। ইসলামের ইতিহাস পড়ে দেখুন। আহলে হাদিস মনে করে সাহাবীদের সমালোচনা করা যাবে না। কিন্তু শিয়ারা সাহাবীদের সমালোচনা করে থাকে। সাহাবীদের মাঝেও অনেক বেঈমান, নাফরমান ছিলো। কেন তাদের সমালোচনা করা যাবে না? নবী পরিবারের সবাইকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে। হজরত আলী ছিলেন নবীর চাচাতো ভাই। এবং নবীকন্যা ফাতিমাকে আলীর কাছে বিয়ে দিয়েছিলেন। আলীকে হত্যা করা হয়। এই হত্যাকাণ্ডের নায়ক মুয়াবিয়া। মুয়াবিয়া আলীর ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করেন এবং আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। নবীকন্যা ফাতিমাকে হত্যা করা হয়। নবীর দুই নাতি হাসান হোসেনকে হত্যা করা হয়। এসব কিছুই সুন্নীরা করেছে।
হজরত মুয়াবিয়া কে ছিলো? মুয়াবিয়া ছিলো দামেস্কের খলিফা। মুয়াবিয়া আমাদের তৃতীয় খলিফা হজরত ওসমানের ভাগিনা ছিলো। আর এই মুয়াবিয়ার ছেলেই ছিলো ইয়াজিদ। যে নবীর নাতি হোসেনকে কারবালায় হত্যা করে। মুয়াবিয়ার প্ররোচনায় নবীর আরেক নাতি হাসানকে তার স্ত্রী জা'দা বিনতে আশ'আছ বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করে। মুয়াবিয়া, ইয়াজিদ সকলেই সুন্নি মুসলমান। দেখবেন আমাদের দেশের মাওলানারা ওয়াজে নবী পরিবারের কাউকে নিয়ে কিছু বলে না। কেবল সাহাবী আর ভুয়া হাদিস নিয়ে ওয়াজ করে।
হাদিস নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। হাদিস চিরন্তন নয়। একমাত্র কোরান চিরন্তন।
নবীর মৃত্যুর ২২৩ বছর পর হাদিস সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। কেনো এতো বছর পর? ইতিমধ্যে তিন জেনারেশন গত হয়েছে। এজন সেজনকে জিজ্ঞেস করে হাদিস লেখা হয়। তাছাড়া হাদিস সংগ্রহকারীদের কেউ আরব ছিলেন না।
ইসলাম ধর্মে (সুন্নি মতানুসারে) সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণিক ছয়টি হাদিস গ্রন্থ সংকলন করেছেন এমন ছয়জন বিখ্যাত মুহাদ্দিসকে একত্রে 'সিহাহ সিত্তাহ'-এর সংকলক বলা হয় ।
১. ইমাম বুখারী (র.) (সহিহ বুখারী): তিনি বর্তমান উজবেকিস্তানের বোখারা শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
২. ইমাম মুসলিম (র.) (সহিহ মুসলিম): তিনি বর্তমান ইরানের নিশাপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
৩. ইমাম আবু দাউদ (র.) (সুনানে আবু দাউদ): তিনি বর্তমান ইরানের সিজিস্তান (Sijistan) বা সিস্তান অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করেন।
৪. ইমাম তিরমিযী (র.) (সুনানে তিরমিযী): তিনি বর্তমান উজবেকিস্তানের তিরমিয (Tirmidh) নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন।
৫. ইমাম নাসাঈ (র.) (সুনানে নাসাঈ): তিনি ইরানের খোরাসান অঞ্চলের 'নাসা' (Nasa) শহরে জন্মগ্রহণ করেন ।
৬. ইমাম ইবনে মাজাহ (র.) (সুনানে ইবনে মাজাহ): তিনি বর্তমান ইরানের কাজভিন (Qazvin) নামক শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
সালাফিপন্থীরা মাজার পুজার বিরোধিতা করে। আমিও করি। ইসলাম ধর্ম বিভিন্ন দেশে গিয়ে সেই দেশের কৃষ্টি সংস্কৃতির সাথে মিশেই কায়েম হয়েছে। আমাদের দেশের মেয়েরা শাড়ি পরেন। সৌদি আরবের মেয়েরা কি শাড়ি পরেন? আমাদের দেশের পুরুষরা যেসব প্যান্ট শার্ট পরেন আরব দেশের মানুষ কি সেসব প্যান্ট শার্ট পরেন? আমাদের খাদ্যাভ্যাস, আমাদের আবহাওয়া কি আরব দেশের মতো? আমাদের দেশের কিছু মুসলমান আরবদের মতো হতে চায়।
আলজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মালয়শিয়া, পাকিস্তান, আজারবাইজান, তুরস্ক, তুর্কমেনিস্তান একেক দেশের বাহ্যিক ইসলাম একেক রকম। ইসলামের মুল ৫ স্তম্ভ ঠিক আছে। ঈমান, নামাজ, রোজা, হজ,যাকাত।
সালাফিপন্থীরা যতই মাজার পুজার বিরোধিতা করুক না কেন এদেশে মাজার পুজা চলবে।
হজরত শাহজালাল, শাহ পরান, খান জাহান আলী, বায়োজিদ বোস্তামি, মাইজভান্ডারির মাজার ভাঙা কি সম্ভব?
এটাকে মাজার পুজা না বলে মাজার জেয়ারত বলাই উত্তম। আমরা তো বাবা মা বা আত্নীয় স্বজনদের কবরও জেয়ারত করি। বাংলাদেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে হজরত শাহজালালের মাজার জেয়ারতের মাধ্যমে। অনেক মানুষ মাজার জেয়ারতের মাধ্যমে তাদের বিশেষ কোনো কাজ শুরু করেন। ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসারে তাদের বড় ভূমিকা আছে।
এখন সবকিছুতে বেদাত খোঁজা একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২৬ মার্চ ২০২৬
কুমিল্লা
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন