আমিও মুক্তিযোদ্ধা
------------------------
বিএনপি নেতা ফজলুর রহমানের বক্তব্য অত্যন্ত বিরক্তিকর। তার মতো মুক্তিযোদ্ধা এই দেশে আর নেই।
তিনি বিরাট মুক্তিযোদ্ধা।
মুক্তিযুদ্ধে আমারও অবদান আছে। আমাদের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লা সেনানিবাস থেকে ১ মাইল পূর্বে। শহর থেকে ১ মাইল পশ্চিমে। সেনানিবাসের লাগোয়া একটা গ্রাম। নাম বরদুইল। এরপর পূর্ব দিকে সব ধানক্ষেত ছিলো। এরপরই আমাদের গ্রাম ঘোড়ামারা। অর্থাৎ বরদুইল আর আমাদের গ্রামের মাঝকানে শুধু ধানক্ষেতের মাঠ। আমি ও আমার সমবয়সীরা তখন ক্লাস থ্রিতে পড়তাম। সেনানিবাস থেকে পাকিস্তান আর্মি নেমে প্রথমে বরদুইল গ্রামে আসতো। এরপর আমাদের গ্রামে। ৩/৪/৫ জনের গ্রুপ। আমি সৎভাবে বলছি, ওরা কাউকে মারধর করেনি। কেউ মুক্তিবাহিনীতে গেছে কিনা তার খোঁজ নিতো আর হিন্দুদের খুঁজতো। আমরা থ্রিতে পড়ুয়া বালকরা যখনি দেখতাম ধানক্ষেতের আইল মাড়িয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যরা আসছে তখনি আমরা দৌঁড়ে বাড়িতে এসে সবাইকে বলে দিতাম। তখন যাদের বয়স ১৮ থেকে ২৫/২৬ তারা সবাই লুকিয়ে যেতেন। আমাদের বাড়ির পেছনে বড় বড় কচুরিপানায় ভর্তি একটা মাঝারি সাইজের ডোবা ছিলো। যুবকরা সেই ডোবায় নেমে লুকিয়ে থাকতেন। কচুরিপানার কারণে কারো মাথা দেখা যেত না। আবার অনেকে শহরের দিকে চলে যেত। তখনো মুরুব্বি শ্রেণির লোকেরা মুক্তিযুদ্ধ বলতেন না। বলতেন, দেশে 'গন্ডগোল' লাগছে। স্বাধীনতার পরেও অনেকে বলেছেন, 'গন্ডগোলের' সময়।
সেনাবাহিনীর সব ইউনিট যুদ্ধ করে না। পদাতিক বাহিনী,গোলন্দাজ বাহিনী মূলত যুদ্ধ করে। মেডিকেল কোর আহত সৈনিকদের চিকিৎসা দেয়। সাপ্লাই কোর যুদ্ধক্ষেত্রে গোলাবারুদ, খাবার সরবরাহ করে, ইঞ্জিনিয়ার্স কোর ভেঙে যাওয়া ব্রিজ, পুল, কালভার্ট মেরামত করে যাতে সৈন্যদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন হয়, সিগনাল কোর শত্রু সৈন্যদের গতিবিধি কমান্ড সেন্টারকে জানিয়ে দেয়। আমরা বালকরা সিগনাল কোরের কাজ করেছি। সেই হিসেবে আমিও একজন মুক্তিযোদ্ধা।
মে মাসের দিকে পাকিস্তান বাহিনী আমাদের গ্রামে এসে মুরুব্বি শ্রেণির লোকদের বলতেন, আমাদের দুই চারটা মুরগী দাও। আমাদের খাবার সংকট। সেনানিবাসের খাবার সরবরাহ করতেন সব বাঙালি ঠিকাদার। তারা সাপ্লাই বন্ধ করে দিয়েছে।
সেনানিবাসের এতো কাছের গ্রাম হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান বাহিনী কাউকে হত্যা করেনি। আমি নিজেই তো সাক্ষী।
প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি।
সব মুক্তিযোদ্ধারা দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেনি। ওই সময় অনেক খারাপ মানুষও মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলো। বিশেষ করে পাকিস্তান আর্মি এসে ধরে নিয়ে যাবে এই ভয়ে। তখন পূর্ব পাকিস্তান অত্যন্ত গরীব দেশ ছিলো। অনেক যুবক বেকার ছিলো। চাকরি নেই। এইসব কারনেও অনেকে মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছিলো। অন্তত পাকিস্তান বাহিনীর কাছে ধরা পড়তে হবে না। তিন বেলা খাবারের নিশ্চয়তা ছিলো। মুক্তিযুদ্ধকে অনেকে চাকরি হিসেবে নিয়েছিলো।
সেনাবাহিনীর কাজ কি? যুদ্ধ লাগলে যুদ্ধ করবে। এইতো। এটা চাকরি নয়? আবার অনেক অপরাধীও মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলো। দেশ স্বাধীনের পর তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আরও বেশি অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। আমি অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে চিনি দেশ স্বাধীনের পর অস্ত্র নিয়ে ডাকাতি করেছে।
ফলে মুক্তিযোদ্ধা মানেই বিরাট কিছু আমি তা মনে করি না। ওই সময় আমার বয়স বেশি হলে আমিও যুদ্ধক্ষেত্রে যেতাম। দেরিতে জন্ম হওয়ায় আমরা সেই সুযোগ পাইনি। এটা কি আমাদের দোষ? বেশিরভাগ মুক্তিযোদ্ধাই মারা গেছেন। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ বিপক্ষ শক্তির বিভাজন করেছে ভারত। জাতি ঐক্যবদ্ধ থাকলে দেশ এগিয়ে যাবে। তাই এই বিভক্তি। ৫৫ বছর পর দেশে কোনো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি বলে কিছু নেই।
বি:দ্র: আমাদের সবার বড় ভাই মি. মালেক চৌধুরী একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন। পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। এই বছর,এই তো একমাস আগে রোজার মাসে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে দাফন করা হয়।
সেনানিবাস থেকে আর্মি টিম আসে। পুলিশ টিম আসে। গার্ড অফ অনার প্রদান করা হয়। জাতীয় পতাকা দিয়ে কফিন মুড়িয়ে দেয়া হয়। বিউগলে করুণ সুর বাজানো হয়। দাফনের আগে ও পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ বাহিনী স্যালুট করে। উভয় পক্ষ থেকে 'শ্রদ্ধাঞ্জলি' লেখা বড় বড় ফুলের তোড়া দেয়া হয় কবরে। সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে এসিল্যান্ড উপস্থিত থেকে শ্রদ্ধা জানান ও ফুলের তোড়া দেন।
আমারা এতো চেতনা নিয়ে চিল্লাই না।
Karim Chowdhury
30 April, 2026
Cumilla.
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন