পাকিস্তানী রাজনীতির অন্যতম খলনায়ক নওয়াজ শরিফ ।
‘স্যার, বিমানের ককপিটে পাইলট আপনাকে আশা করছেন’। আমার মিলিটারি সেক্রেটারি নাদিম তাজের চাপা কন্ঠস্বর কানে এলো । বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘তবে কি করতে হবে’। ল্যান্ডিংয়ের সময় আমরা যেন বিমানের ককপিটে অবস্থান করি, এমন প্রত্যাশা পাইলটের নিশ্চয়ই নয় ।
আমরা কলম্বো থেকে রওনা হয়ে এখন কিছুক্ষনের মধ্যেই করাচিতে অবতরণ করেতে যাচ্ছি, প্রায় আট হাজার ফুট উঁচু থেকে আমাদের এই অবতরণ । বিমানের সিট বেল্ট বাঁধা ও ধূমপান থেকে বিরত থাকার নির্দেশের সুইচ অন করে দেয়া হয়েছে । আকাশ থেকে শতশত ফুট নিচে শহরটির মিটি মিটি আলো দেখা যাচ্ছে ।
সেদিন ছিলো ১২ অক্টোবর ১৯৯১ । ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিট । ফ্লাইটটি ছিলো পি.কে ৮০৫ । এটি একটি এয়ার বাস । ১৯৮ জন যাত্রী আরোহণ করেছিলো । অধিকাংশই স্কুল পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী । ১০ মিনিটের মধ্যেই আমরা অবতরণ করতে যাচ্ছি । বিমান উড়ার পর পলক যেতে না যেতেই কিছু ক্ষুদে যাত্রী, ছাত্রছাত্রী, আমার আসন ঘিরে দাঁড়ালো । একেবারে সম্মুখভাগে ছিলো আমার আসন । ক্ষুদে যাত্রীদের উদ্দেশ্য, আমার অটোগ্রাফ নেয়া এবং কিছু ছবি তোলা । সেহবা ছিলো আমার পাশের সীটে জানালার পাশে ।
‘স্যার, ককপিটে পাইলট আপনাকে প্রত্যাশা করছে’। আমার মিলিটারি সেক্রেটারি আবার স্মরণ করিয়ে দিলেন ব্যাপারটি । তবে তার কন্ঠ ছিলো এবার আরো অস্থির ।
নিশ্চিতভাবেই অপ্রত্যাশিত কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে । তাড়া দিতে লাগলেন তিনি । বিমানের সম্মুখে, পাইলটের দিকে যাত্রা নির্দেশ করলো সে । এবার বললো, পাইলট তাকে জানিয়েছে- আমাদের বিমানটির পাকিস্তানের কোনো এয়ার ফিল্ডে অবতরণের অনুমোদন নেই । যতো শিগগির সম্ভব পাকিস্তানের আকাশ সীমানা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ ।
তখনি ককপিটের দরজা খোলার নির্দেশ দিলাম স্টুয়ার্ডকে । আমার নির্দেশে সেখানে পর্দা টানা হলো । এ ব্যাপারে কোনো যাত্রী যেন বিন্ধু-বিসর্গও আঁচ করতে না পারে তার উপর কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা জারি করলাম । আমার এডিকং (সহচর) ও মিলিটারি সেক্রেটারি জানালেন, করাচির কোর কমান্ডারের কিংবা তাদের সহযোগী কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ চেষ্টা চালানো হচ্ছে । প্রকৃত বিষয় জানার জন্য সকল প্রচেষ্টা চলছিলো । শুধু তাই নয়, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স (পিআইএ)-এর ভূ-পৃষ্ঠ রিলে-প্যাচ সিস্টেমের মাধ্যমেও তথ্য জানার চেষ্টা চলছে । আমি ককপিটে ঢোকার আগেই পনের মিনিটের দুর্লভ জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে । ককপিটে প্রবেশ করে আমি পাইলটের কাছে বিস্তারিত জানতে চাইলাম । পাইলট জানালো, করাচিতে আমাদের বিমান ল্যান্ডিংয়ের অনুমতি তারা দিচ্ছে না । এমন কি এই নিষেধাজ্ঞার নির্দিষ্ট কোনো কারণও তারা জানাতে নারাজ । কতৃপক্ষের নির্দেশ, আমরা যেন এখনি ‘পাকিস্তানের আকাশসীমা ছেড়ে বিদেশের কোনো মাটিতে অবতরণ করি’ ।
‘স্যার, আমার মনে হয় আপনার কারনেই এই সমস্যা’। পাইলোটের নিশ্চিত উক্তি ছিলো এটি । পাইলটের উক্তিতে আমি দারুণ আহত হই । যদিও তার মন্ত্যবটি ছিলো রূঢ় সত্য । আমি শুধু এটুকুই নিশ্চিত বুঝতে পারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আমার বিরুদ্ধে গিয়েছেন । কিন্তু এতোগুলো নিরপরাধ প্রাণের বিরুদ্ধে তার এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ভয়াবহ ।
‘খুব বেশি হলে আর ঘন্টা খানেকের জ্বালানি মওজুদ আছে’। আমাকে উদ্দেশ্য করে পাইলট হতাশার কন্ঠে বললেন । আমি তাকে আবার ‘এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল’-এ যোগাযোগের জন্য বললাম । সে আমার কথা মতো চেষ্টা চালালো । মিনিট পাঁচেক পর প্রতি উত্তর এলো ‘ বর্তমান স্তর থেকে উঠে যাও ২১০০০ হাজার ফুট উচ্চতায় । পাকিস্তানের সীমানা ছাড়ো এবং চলে যাও যে কোনো স্থানে । এবারও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল কোনো কারণ ছাড়াই এ নির্দেশ পাঠালো । অতন্ত নির্মম মনে হয়েছিলো এ সকল কিছু । স্বল্প জ্বালানীর কারনে ভারত ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার আমাদের উপায় নেই । ভারতে গেলে সেটা হবে আমাদের শত্রুর হাতে স্বেচ্ছায় ধরা দেয়া । পাকিস্তানের সামরিক প্রধান এবং তার সেক্রেটারি বিমানে অবস্থান করছে অথচ নিজ দেশের কোনো বন্দরে তাদের অবতরণের কোনো অনুমতি নেই । এই অজুহাতে শত্রুর দেশে আশ্রয় লাভের প্রার্থনা করা কোনো যৌক্তিকতাতেই আসে না । এদিকে আমি আমার সেনাবাহিনীকে ভালো জানি । সেখানে বিদ্রোহ হওয়ার কোনো কারন নেই । আর কী হতে পারে । সেনাবাহিনী তাদের চিফকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার মতো লজ্জাজনক কাজ করবে না ।
এই পরিস্থিতির পেছনে একমাত্র সরকারের বেসামরিক অংশই কাজ করছে । আর এমন জঘন্য নির্দেশ দিতে পারে কেবল প্রধানমন্ত্রী । একজন সামরিক প্রধানকে সরিয়ে ফেলা এক কথা, কিন্তু তার বিমান হাইজ্যাক করে ভারতের হাতে সোপর্দ করার বিষয়টিকে আমি বলবো পৈশাচিক কর্মকাণ্ড । পাক আর্মির বিরুদ্ধে নওয়াজ শরিফ যে কৌশল অবলম্বন করেছেন তা ভারতের জন্য বিজয়সূচক ইঙ্গিত- বিষয়টি তাকে একটুও নাড়া দিলো না ! বিস্ময়ে হতবাক হলাম কিভাবে তিনি এমন ন্যাকারজনক এবং গর্হিত কাজে উদ্যত হলেন । পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রধান- প্রকৃতপক্ষে তার নিজ সেনাবাহিনী, আর তাকেই পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে শত্রুর কবলে । আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমাদের বিবাদ শুধুমাত্র হাজার ফুট নিচের মাটির সাথেই নয়, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথেও ।
‘এখন আমরা কোথায় যেতে পারি’? পাইলটের কাছে আমার উদ্বেগপূর্ন প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম । আমরা ভারতের আহমেদাবাদ কিংবা ওমান পর্যন্ত যেতে পারি । জানালো সে । তবে এখনি সিদ্ধান্ত নিতে হবে –আমরা কোথায় যাবো । কারন আমাদের জ্বালানি দ্রুত শেষ হয়ে আসছে ।
‘আমার মৃতদেহ মাড়িয়ে তোমরা ভারতে যেতে পারো’।
ক্ষুব্ধ হয়ে ঘোষণা দিলাম আমি । ককপিটে উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে লাগলো । বলে উঠলাম ।
‘কি কারনে আমাদের ল্যান্ডিংয়ের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না বিষয়টি আমি জানতে চাই’। আমি বললাম, ‘এটি একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইট । তা সত্ত্বেও কেন স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে’। আমার মনে হয়, বিশ্বের ইতিহাসে এটাই কোনো প্রথম ঘটনা যে, ভূমিতে থেকে আকাশে উড্ডয়মান বিমান হাইজ্যাকের সাথে কোনো ব্যক্তি সম্পৃক্ত । আর এটা শুধু ‘কোনো ব্যক্তি’ নয়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যে কিনা তার নিজ দেশের কিছু জনগনের মুল্যবান জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন । আমরা যখন প্রতি উত্তরের অপেক্ষায় আমাদের বিমানটি তখন ভূমি থেকে ২১০০০ হাজার ফুট উপরে (৬,৪০০ মিটার)। পাইলট জানালো, ২১০০০ হাজার ফুট উঁচুতে আমাদের বিমান উঠে আসায় মজুদ জ্বালানির ব্যাপক অংশের অপচয় হয়েছে । এ অবস্থায় পাক-সীমার বাইরে কোথাও ল্যান্ডিংয়ের পর্যাপ্ত জ্বালানিও অবশিষ্ট নেই ।‘প্রকৃতপক্ষে সশরীরে এটা এখন প্রায় অসম্ভব’। সর্বশেষ প্রচেষ্টা চালালাম । পাইলটকে নির্দেশ দিলাম ল্যান্ড করাও । প্রায় দু’শ আরোহী বিমানে অবস্থান করছে । এ অবস্থায় আমরা করাচিতেই নামবো । এটা তারা পছন্দ করুক আর নাই করুক ।
‘অবিশ্বাস্য ! প্রশ্নই আসে না' , তাদের উত্তর । এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে নাড়ানো গেলো না এক চুলও । দ্বিধাহীন কন্ঠে জানিয়ে দিলো যে, পাকিস্তানের কোনো এয়ার ফিল্ডে আলো জ্বলবে না । করাচির তিনটি বন্দরের রানওয়েতে ইতোমধ্যেই দাহ্য পদার্থপূর্ন ট্রাক রাখা হয়েছে ।‘করাচির কোনো বন্দরে ল্যান্ডিং এখন প্রশ্নাতীত । কারন এতে বিধ্বস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে’।
ক্যাপ্টেনের কন্ঠ থেকে উদ্বিগ্ন স্বর বেরিয়ে এলো । এতে ককপিটে উপস্থিত আমাদের সবারই উদ্বেগ বেড়ে গেলো দ্বিগুণ । আমি বুঝতে পারলাম- এ পরিস্থিতিতে আমাকে শান্ত থাকতে হবে । দৃঢ় মনোভাব ফুটিয়ে তুলতে হবে সবার কাছে । আমার কন্ঠ হবে নিয়ন্ত্রিত এবং কতৃত্বপূর্ন । কোনোমতেই বিমানের পাইলট কিংবা ককপিটের অন্যদের কাছে কোনো রকম দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না ।
আমি আবারো পাইলটকে নির্দেশ দিলাম সে যেন কন্ট্রোলারকে জানিয়ে দেয় যে ‘আমাদের পক্ষে পাকিস্তানের আকাশ সীমা ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয় । কেননা পাকিস্তান ছেড়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি আমাদের বিমানে মজুদ নেই । আমাদের অবশ্যই করাচিতে অবতরণের অনুমতি দিতে হবে’ । আমি তাদের জানিয়ে দেয়ার স্পষ্ট নির্দেশ দিলাম ।
কিন্তু এর আগেই আমাদের ভাগ্যের দুয়ার বন্ধ হয়ে গেলো । আমাদের বলা হলো নওয়াব শাহ-এ নামতে পারি । মনঃস্থির করলাম, শেষ প্রচেষ্টা নওয়াব শাহ । নওয়াব শাহ করাচির ১০০ মাইল(১৬০ কিলোমিটার) উত্তরের মফস্বল শহর । সিন্ধুর মরু প্রদেশ । আমি পাইলটকে বললাম, ‘কি সেখানে যাবার মতো জ্বালানি আছে’?
‘আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি’। পাইলটের আশাব্যঞ্জনক উত্তর ।‘তাহলে ঠিক আছে, নওয়াব শাহের দিকে চলুন’।
তখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা । ৪৫ মিনিট পার হয়ে গেছে । নওয়াব শাহ আর প্রায় অর্ধেক ।
এমন সময় এয়ার ক্রাফট রেডিওটি আকস্মিক বেজে উঠলো । পাইলটকে উদ্দেশ্য করে বলা হলো বিমানটি যেন করাচিতেই অবতরণ করে । কিন্তু এ নির্দেশে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে । বিমানে যে জ্বালানি অবশিষ্ট, তাতে করাচি পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে কিনা এটাই ছিলো তার ভাবনা । অবশিষ্ট জ্বালানির সাথে দূরত্ব অতিক্রমের হিসেব কষা শুরু করলো সে । কিন্তু তাতেও সে উদ্বিগ্ন ছিলো-করাচি পর্যন্ত পৌঁছা আদৌ সম্ভব হবে কি-না । আকস্মিক এই মানসিকতার পরিবর্তন আমরা কেউ সহজভাবে মেনে নিতে পারছিলাম না । অপ্রত্যাশিত এই নির্দেশ কার কাছ থেকে এলো ? শেষ মুহূর্তে কার মনে এমন মানবিক ভাবোদয় হলো, আর এর পেছনে কারন কি ? ভূপৃষ্ঠে কি তবে বিপদ আসন্ন ?
আমরা যখন এসব আবোল তাবোল কল্পনা করছি, আর পাইলটও যখন তার হিসাব নিয়ে ব্যস্ত, এমন সময় করাচির সামরিক বিভাগের কমান্ডার মেজর জেনারেল ইফতিখার আলি খান এয়ার ক্রাফটের সাথে যোগাযোগ করেন । পাইলটকে বললেন, ’চিফকে বলুন ফিরে আসতে এবং করাচিতেই অবতরণ করতে । এখানে সব কিছুই ঠিক আছে’।
তারপরও আমার মন থেকে সন্দেহ দূর হলো না । ফলে আমি নিজেই ইফতেখারের সাথে কথা বললাম । তার সাথে কথা বলার পর আমি নিশ্চিত হতে পারলাম যে, তিনি প্রকৃতই ইফতেখার এবং তাকে কেউ এ বিষয়ে প্ররোচিত করেনি । নিশ্চিত হলাম আর কেউ তাকে আমাদের ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য করেনি । বিমানে থেকে বেতার বার্তায় কথা বলার ঘটনা আমার এটাই প্রথম ।
‘কোর কমান্ডার কোথায়’ আমি প্রশ্ন করলাম ।
‘স্যার, কোর কমান্ডার এখন ভিআইপি লাউঞ্জে । তিনি লাউঞ্জের গেটে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন । আর আমি এই ট্রাফিক কন্ট্রোল কক্ষে’।
‘সমস্যাটা কি?’
‘স্যার আমি প্রায় নিশ্চিত আপনি জানেন না । মাত্র দু’ঘন্টা আগে আপনার অবসরদানের ঘোষণা দেয়া হয় । আর স্থলাভিষিক্ত হন লেফটেন্যাট জেনারেল জিয়াউদ্দিন বাট । আপনারা যাতে করাচিতে অবতরণ করতে না পারেন তারই প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন তারা । কিন্তু সমগ্র পরিস্থিতি এখন আর্মিদের হাতে । বিমান বন্দরের নিয়ন্ত্রনও আমরা নিয়ে ফেলেছি । আপনি এখন ফিরে আসতে পারেন । তারপরই বিস্তারিত জানতে পারবেন ।
আমি আরো নিশ্চিত হতে চেষ্টা করলাম । এ কারনে তাকে প্রশ্ন করলাম,‘আচ্ছা আপনি কি আমার কুকুরগুলোর নাম বলতে পারেন’? এমন প্রশ্ন করেছিলাম কারন আমি নিশ্চিত যে, সে আমার কুকুরগুলোর নাম জানে । আমাদের অবতরনে যদি অন্য কারো হাত থাকে বা ষড়যন্ত্রমূলক কোনো অভিপ্রায় থাকে তবে অপরপ্রান্তের বক্তা এ নামগুলো ভুল করতে পারে ।
‘ডড আর বাডি, স্যার’। কোনো রকম জড়তা ছাড়াই নামগুলো উচ্চারণ করলো সে । এমন কি এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতির মধ্যেও তার মুখে মৃদু হাসির আভাস পেলাম ।
‘আপনাকে ধন্যবাদ ইফতেখার’। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ‘মাহমুদ এবং আজিজকে বলুন, যেন তাদের কেউ দেশ ছেড়ে না যায় । মাহমুদ আহমেদ রাওয়ালপিন্ডির দশম কোরের কমান্ডার এবং মোহাম্মদ আজিজ খান জেনারেল স্টাফের প্রধান । দু’জনই পদবিতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল । এবার আমি দৃষ্টি দিলাম পাইলটের দিকে । তাকে জ্বালানির চূড়ান্ত অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম ।‘আপনি আমাদের করাচিতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন’?
‘আমরা এখন মাঝপথে । আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি । তবে স্যার, আপনাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে । ফিরতি পথে যদি সামান্যতম কোনো সমস্যা হয় তবে আমরা বিধ্বস্ত হবো’।
‘তারপরও করাচিতেই ফিরে চলুন’। আমি বললাম । পরবর্তী কয়েকটি মুহুর্ত ছিলো দুঃসহ উদ্বিগ্নতার । পরতে পরতে বিপদের সমুহ সম্ভবনা । একটুখানি অমনোযোগ কিংবা বাতাসের গতি পরিবর্তন অথবা অন্য কোনো সামান্যতম প্রতিকূলতায় আমরা বিধ্বস্ত হবো । মাত্র ৭ মিনিটের জ্বালানি থাকা অবস্থায় আমরা অবশেষে অবতরণ করলাম । কোর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল উসমানী, বিভাগীয় কমান্ডার ইফতিখার এবং আরো কিছু কর্মকর্তা-সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলেন । আমার শুধু এটাই মনে হলো-আমি মৃত্যর মুখ থেকে ফিরেছি । আমি বেঁচে আছি । এর চেয়েও বেশি সুখের বিষয় সেহবা এবং বিমানের অন্যান্য যাত্রী, বিশেষ করে নিষ্পাপ শিশুরা নিরাপদ অবতরণ করতে পেরেছে ।এই শ্বাসরুদ্ধকর নাটকীয় স্মৃতি আমার মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে ।
সুত্রঃ In The Line Of Fire (সংক্ষেপিত)
Parvez Mosharraf
বিঃদ্রঃ এসব কথা মানুষ বানিয়ে লিখে ? আমার আগের এক পোষ্টে এক ভদ্রলোক কমেন্ট করেছিলো এই বই নাকি সিআইএ কম্পোজ করেছে । আমি তাকে কিছু বলিনি । তবে তাকে ব্লক করবো কাল । আমি চাই এই পোষ্ট সে পড়ুক । কিছু চেংড়া পোলা কয়েকটা পাঠ্যপুস্তক পড়ে বিএ, এমএ পাশ করে নিজেকে কি যে ভাবে ? তাদের জন্য সত্যি করুণা হয় । আমি যদি পারভেজ মোশাররফ হতাম তবে ল্যান্ড করার ১ ঘন্টার মধ্যে নওয়াজ শরিফের পুরো ফ্যালিলিকে মিসাইল মেরে উড়িয়ে দিতাম । খলনায়ক নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে পারভেজ মোশাররফ ক্যু করেনি । তার অনুপস্থিতিতে সেনাবাহিনীই ক্যু করেছিলো । ভুপেন একটু লেখা পড়া করো । ফেসবুকে একাউন্ট খোলে আতলামি করো না ।
‘স্যার, বিমানের ককপিটে পাইলট আপনাকে আশা করছেন’। আমার মিলিটারি সেক্রেটারি নাদিম তাজের চাপা কন্ঠস্বর কানে এলো । বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করলাম, ‘তবে কি করতে হবে’। ল্যান্ডিংয়ের সময় আমরা যেন বিমানের ককপিটে অবস্থান করি, এমন প্রত্যাশা পাইলটের নিশ্চয়ই নয় ।
আমরা কলম্বো থেকে রওনা হয়ে এখন কিছুক্ষনের মধ্যেই করাচিতে অবতরণ করেতে যাচ্ছি, প্রায় আট হাজার ফুট উঁচু থেকে আমাদের এই অবতরণ । বিমানের সিট বেল্ট বাঁধা ও ধূমপান থেকে বিরত থাকার নির্দেশের সুইচ অন করে দেয়া হয়েছে । আকাশ থেকে শতশত ফুট নিচে শহরটির মিটি মিটি আলো দেখা যাচ্ছে ।
সেদিন ছিলো ১২ অক্টোবর ১৯৯১ । ঘড়িতে তখন সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিট । ফ্লাইটটি ছিলো পি.কে ৮০৫ । এটি একটি এয়ার বাস । ১৯৮ জন যাত্রী আরোহণ করেছিলো । অধিকাংশই স্কুল পড়ুয়া ছাত্রছাত্রী । ১০ মিনিটের মধ্যেই আমরা অবতরণ করতে যাচ্ছি । বিমান উড়ার পর পলক যেতে না যেতেই কিছু ক্ষুদে যাত্রী, ছাত্রছাত্রী, আমার আসন ঘিরে দাঁড়ালো । একেবারে সম্মুখভাগে ছিলো আমার আসন । ক্ষুদে যাত্রীদের উদ্দেশ্য, আমার অটোগ্রাফ নেয়া এবং কিছু ছবি তোলা । সেহবা ছিলো আমার পাশের সীটে জানালার পাশে ।
‘স্যার, ককপিটে পাইলট আপনাকে প্রত্যাশা করছে’। আমার মিলিটারি সেক্রেটারি আবার স্মরণ করিয়ে দিলেন ব্যাপারটি । তবে তার কন্ঠ ছিলো এবার আরো অস্থির ।
নিশ্চিতভাবেই অপ্রত্যাশিত কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে । তাড়া দিতে লাগলেন তিনি । বিমানের সম্মুখে, পাইলটের দিকে যাত্রা নির্দেশ করলো সে । এবার বললো, পাইলট তাকে জানিয়েছে- আমাদের বিমানটির পাকিস্তানের কোনো এয়ার ফিল্ডে অবতরণের অনুমোদন নেই । যতো শিগগির সম্ভব পাকিস্তানের আকাশ সীমানা ছেড়ে যাওয়ার নির্দেশ ।
তখনি ককপিটের দরজা খোলার নির্দেশ দিলাম স্টুয়ার্ডকে । আমার নির্দেশে সেখানে পর্দা টানা হলো । এ ব্যাপারে কোনো যাত্রী যেন বিন্ধু-বিসর্গও আঁচ করতে না পারে তার উপর কড়াকড়ি নিষেধাজ্ঞা জারি করলাম । আমার এডিকং (সহচর) ও মিলিটারি সেক্রেটারি জানালেন, করাচির কোর কমান্ডারের কিংবা তাদের সহযোগী কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ চেষ্টা চালানো হচ্ছে । প্রকৃত বিষয় জানার জন্য সকল প্রচেষ্টা চলছিলো । শুধু তাই নয়, পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইন্স (পিআইএ)-এর ভূ-পৃষ্ঠ রিলে-প্যাচ সিস্টেমের মাধ্যমেও তথ্য জানার চেষ্টা চলছে । আমি ককপিটে ঢোকার আগেই পনের মিনিটের দুর্লভ জ্বালানি শেষ হয়ে গেছে । ককপিটে প্রবেশ করে আমি পাইলটের কাছে বিস্তারিত জানতে চাইলাম । পাইলট জানালো, করাচিতে আমাদের বিমান ল্যান্ডিংয়ের অনুমতি তারা দিচ্ছে না । এমন কি এই নিষেধাজ্ঞার নির্দিষ্ট কোনো কারণও তারা জানাতে নারাজ । কতৃপক্ষের নির্দেশ, আমরা যেন এখনি ‘পাকিস্তানের আকাশসীমা ছেড়ে বিদেশের কোনো মাটিতে অবতরণ করি’ ।
‘স্যার, আমার মনে হয় আপনার কারনেই এই সমস্যা’। পাইলোটের নিশ্চিত উক্তি ছিলো এটি । পাইলটের উক্তিতে আমি দারুণ আহত হই । যদিও তার মন্ত্যবটি ছিলো রূঢ় সত্য । আমি শুধু এটুকুই নিশ্চিত বুঝতে পারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আমার বিরুদ্ধে গিয়েছেন । কিন্তু এতোগুলো নিরপরাধ প্রাণের বিরুদ্ধে তার এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে ভয়াবহ ।
‘খুব বেশি হলে আর ঘন্টা খানেকের জ্বালানি মওজুদ আছে’। আমাকে উদ্দেশ্য করে পাইলট হতাশার কন্ঠে বললেন । আমি তাকে আবার ‘এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল’-এ যোগাযোগের জন্য বললাম । সে আমার কথা মতো চেষ্টা চালালো । মিনিট পাঁচেক পর প্রতি উত্তর এলো ‘ বর্তমান স্তর থেকে উঠে যাও ২১০০০ হাজার ফুট উচ্চতায় । পাকিস্তানের সীমানা ছাড়ো এবং চলে যাও যে কোনো স্থানে । এবারও এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল কোনো কারণ ছাড়াই এ নির্দেশ পাঠালো । অতন্ত নির্মম মনে হয়েছিলো এ সকল কিছু । স্বল্প জ্বালানীর কারনে ভারত ছাড়া অন্য কোথাও যাওয়ার আমাদের উপায় নেই । ভারতে গেলে সেটা হবে আমাদের শত্রুর হাতে স্বেচ্ছায় ধরা দেয়া । পাকিস্তানের সামরিক প্রধান এবং তার সেক্রেটারি বিমানে অবস্থান করছে অথচ নিজ দেশের কোনো বন্দরে তাদের অবতরণের কোনো অনুমতি নেই । এই অজুহাতে শত্রুর দেশে আশ্রয় লাভের প্রার্থনা করা কোনো যৌক্তিকতাতেই আসে না । এদিকে আমি আমার সেনাবাহিনীকে ভালো জানি । সেখানে বিদ্রোহ হওয়ার কোনো কারন নেই । আর কী হতে পারে । সেনাবাহিনী তাদের চিফকে ভারতের হাতে তুলে দেয়ার মতো লজ্জাজনক কাজ করবে না ।
এই পরিস্থিতির পেছনে একমাত্র সরকারের বেসামরিক অংশই কাজ করছে । আর এমন জঘন্য নির্দেশ দিতে পারে কেবল প্রধানমন্ত্রী । একজন সামরিক প্রধানকে সরিয়ে ফেলা এক কথা, কিন্তু তার বিমান হাইজ্যাক করে ভারতের হাতে সোপর্দ করার বিষয়টিকে আমি বলবো পৈশাচিক কর্মকাণ্ড । পাক আর্মির বিরুদ্ধে নওয়াজ শরিফ যে কৌশল অবলম্বন করেছেন তা ভারতের জন্য বিজয়সূচক ইঙ্গিত- বিষয়টি তাকে একটুও নাড়া দিলো না ! বিস্ময়ে হতবাক হলাম কিভাবে তিনি এমন ন্যাকারজনক এবং গর্হিত কাজে উদ্যত হলেন । পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রধান- প্রকৃতপক্ষে তার নিজ সেনাবাহিনী, আর তাকেই পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে শত্রুর কবলে । আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি আমাদের বিবাদ শুধুমাত্র হাজার ফুট নিচের মাটির সাথেই নয়, বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথেও ।
‘এখন আমরা কোথায় যেতে পারি’? পাইলটের কাছে আমার উদ্বেগপূর্ন প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম । আমরা ভারতের আহমেদাবাদ কিংবা ওমান পর্যন্ত যেতে পারি । জানালো সে । তবে এখনি সিদ্ধান্ত নিতে হবে –আমরা কোথায় যাবো । কারন আমাদের জ্বালানি দ্রুত শেষ হয়ে আসছে ।
‘আমার মৃতদেহ মাড়িয়ে তোমরা ভারতে যেতে পারো’।
ক্ষুব্ধ হয়ে ঘোষণা দিলাম আমি । ককপিটে উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে লাগলো । বলে উঠলাম ।
‘কি কারনে আমাদের ল্যান্ডিংয়ের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না বিষয়টি আমি জানতে চাই’। আমি বললাম, ‘এটি একটি বাণিজ্যিক ফ্লাইট । তা সত্ত্বেও কেন স্থানান্তরের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে’। আমার মনে হয়, বিশ্বের ইতিহাসে এটাই কোনো প্রথম ঘটনা যে, ভূমিতে থেকে আকাশে উড্ডয়মান বিমান হাইজ্যাকের সাথে কোনো ব্যক্তি সম্পৃক্ত । আর এটা শুধু ‘কোনো ব্যক্তি’ নয়, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যে কিনা তার নিজ দেশের কিছু জনগনের মুল্যবান জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন । আমরা যখন প্রতি উত্তরের অপেক্ষায় আমাদের বিমানটি তখন ভূমি থেকে ২১০০০ হাজার ফুট উপরে (৬,৪০০ মিটার)। পাইলট জানালো, ২১০০০ হাজার ফুট উঁচুতে আমাদের বিমান উঠে আসায় মজুদ জ্বালানির ব্যাপক অংশের অপচয় হয়েছে । এ অবস্থায় পাক-সীমার বাইরে কোথাও ল্যান্ডিংয়ের পর্যাপ্ত জ্বালানিও অবশিষ্ট নেই ।‘প্রকৃতপক্ষে সশরীরে এটা এখন প্রায় অসম্ভব’। সর্বশেষ প্রচেষ্টা চালালাম । পাইলটকে নির্দেশ দিলাম ল্যান্ড করাও । প্রায় দু’শ আরোহী বিমানে অবস্থান করছে । এ অবস্থায় আমরা করাচিতেই নামবো । এটা তারা পছন্দ করুক আর নাই করুক ।
‘অবিশ্বাস্য ! প্রশ্নই আসে না' , তাদের উত্তর । এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলকে নাড়ানো গেলো না এক চুলও । দ্বিধাহীন কন্ঠে জানিয়ে দিলো যে, পাকিস্তানের কোনো এয়ার ফিল্ডে আলো জ্বলবে না । করাচির তিনটি বন্দরের রানওয়েতে ইতোমধ্যেই দাহ্য পদার্থপূর্ন ট্রাক রাখা হয়েছে ।‘করাচির কোনো বন্দরে ল্যান্ডিং এখন প্রশ্নাতীত । কারন এতে বিধ্বস্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে’।
ক্যাপ্টেনের কন্ঠ থেকে উদ্বিগ্ন স্বর বেরিয়ে এলো । এতে ককপিটে উপস্থিত আমাদের সবারই উদ্বেগ বেড়ে গেলো দ্বিগুণ । আমি বুঝতে পারলাম- এ পরিস্থিতিতে আমাকে শান্ত থাকতে হবে । দৃঢ় মনোভাব ফুটিয়ে তুলতে হবে সবার কাছে । আমার কন্ঠ হবে নিয়ন্ত্রিত এবং কতৃত্বপূর্ন । কোনোমতেই বিমানের পাইলট কিংবা ককপিটের অন্যদের কাছে কোনো রকম দুর্বলতা প্রকাশ করা যাবে না ।
আমি আবারো পাইলটকে নির্দেশ দিলাম সে যেন কন্ট্রোলারকে জানিয়ে দেয় যে ‘আমাদের পক্ষে পাকিস্তানের আকাশ সীমা ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয় । কেননা পাকিস্তান ছেড়ে যাওয়ার মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি আমাদের বিমানে মজুদ নেই । আমাদের অবশ্যই করাচিতে অবতরণের অনুমতি দিতে হবে’ । আমি তাদের জানিয়ে দেয়ার স্পষ্ট নির্দেশ দিলাম ।
কিন্তু এর আগেই আমাদের ভাগ্যের দুয়ার বন্ধ হয়ে গেলো । আমাদের বলা হলো নওয়াব শাহ-এ নামতে পারি । মনঃস্থির করলাম, শেষ প্রচেষ্টা নওয়াব শাহ । নওয়াব শাহ করাচির ১০০ মাইল(১৬০ কিলোমিটার) উত্তরের মফস্বল শহর । সিন্ধুর মরু প্রদেশ । আমি পাইলটকে বললাম, ‘কি সেখানে যাবার মতো জ্বালানি আছে’?
‘আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি’। পাইলটের আশাব্যঞ্জনক উত্তর ।‘তাহলে ঠিক আছে, নওয়াব শাহের দিকে চলুন’।
তখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা । ৪৫ মিনিট পার হয়ে গেছে । নওয়াব শাহ আর প্রায় অর্ধেক ।
এমন সময় এয়ার ক্রাফট রেডিওটি আকস্মিক বেজে উঠলো । পাইলটকে উদ্দেশ্য করে বলা হলো বিমানটি যেন করাচিতেই অবতরণ করে । কিন্তু এ নির্দেশে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে । বিমানে যে জ্বালানি অবশিষ্ট, তাতে করাচি পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে কিনা এটাই ছিলো তার ভাবনা । অবশিষ্ট জ্বালানির সাথে দূরত্ব অতিক্রমের হিসেব কষা শুরু করলো সে । কিন্তু তাতেও সে উদ্বিগ্ন ছিলো-করাচি পর্যন্ত পৌঁছা আদৌ সম্ভব হবে কি-না । আকস্মিক এই মানসিকতার পরিবর্তন আমরা কেউ সহজভাবে মেনে নিতে পারছিলাম না । অপ্রত্যাশিত এই নির্দেশ কার কাছ থেকে এলো ? শেষ মুহূর্তে কার মনে এমন মানবিক ভাবোদয় হলো, আর এর পেছনে কারন কি ? ভূপৃষ্ঠে কি তবে বিপদ আসন্ন ?
আমরা যখন এসব আবোল তাবোল কল্পনা করছি, আর পাইলটও যখন তার হিসাব নিয়ে ব্যস্ত, এমন সময় করাচির সামরিক বিভাগের কমান্ডার মেজর জেনারেল ইফতিখার আলি খান এয়ার ক্রাফটের সাথে যোগাযোগ করেন । পাইলটকে বললেন, ’চিফকে বলুন ফিরে আসতে এবং করাচিতেই অবতরণ করতে । এখানে সব কিছুই ঠিক আছে’।
তারপরও আমার মন থেকে সন্দেহ দূর হলো না । ফলে আমি নিজেই ইফতেখারের সাথে কথা বললাম । তার সাথে কথা বলার পর আমি নিশ্চিত হতে পারলাম যে, তিনি প্রকৃতই ইফতেখার এবং তাকে কেউ এ বিষয়ে প্ররোচিত করেনি । নিশ্চিত হলাম আর কেউ তাকে আমাদের ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য করেনি । বিমানে থেকে বেতার বার্তায় কথা বলার ঘটনা আমার এটাই প্রথম ।
‘কোর কমান্ডার কোথায়’ আমি প্রশ্ন করলাম ।
‘স্যার, কোর কমান্ডার এখন ভিআইপি লাউঞ্জে । তিনি লাউঞ্জের গেটে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন । আর আমি এই ট্রাফিক কন্ট্রোল কক্ষে’।
‘সমস্যাটা কি?’
‘স্যার আমি প্রায় নিশ্চিত আপনি জানেন না । মাত্র দু’ঘন্টা আগে আপনার অবসরদানের ঘোষণা দেয়া হয় । আর স্থলাভিষিক্ত হন লেফটেন্যাট জেনারেল জিয়াউদ্দিন বাট । আপনারা যাতে করাচিতে অবতরণ করতে না পারেন তারই প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন তারা । কিন্তু সমগ্র পরিস্থিতি এখন আর্মিদের হাতে । বিমান বন্দরের নিয়ন্ত্রনও আমরা নিয়ে ফেলেছি । আপনি এখন ফিরে আসতে পারেন । তারপরই বিস্তারিত জানতে পারবেন ।
আমি আরো নিশ্চিত হতে চেষ্টা করলাম । এ কারনে তাকে প্রশ্ন করলাম,‘আচ্ছা আপনি কি আমার কুকুরগুলোর নাম বলতে পারেন’? এমন প্রশ্ন করেছিলাম কারন আমি নিশ্চিত যে, সে আমার কুকুরগুলোর নাম জানে । আমাদের অবতরনে যদি অন্য কারো হাত থাকে বা ষড়যন্ত্রমূলক কোনো অভিপ্রায় থাকে তবে অপরপ্রান্তের বক্তা এ নামগুলো ভুল করতে পারে ।
‘ডড আর বাডি, স্যার’। কোনো রকম জড়তা ছাড়াই নামগুলো উচ্চারণ করলো সে । এমন কি এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতির মধ্যেও তার মুখে মৃদু হাসির আভাস পেলাম ।
‘আপনাকে ধন্যবাদ ইফতেখার’। তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, ‘মাহমুদ এবং আজিজকে বলুন, যেন তাদের কেউ দেশ ছেড়ে না যায় । মাহমুদ আহমেদ রাওয়ালপিন্ডির দশম কোরের কমান্ডার এবং মোহাম্মদ আজিজ খান জেনারেল স্টাফের প্রধান । দু’জনই পদবিতে লেফটেন্যান্ট জেনারেল । এবার আমি দৃষ্টি দিলাম পাইলটের দিকে । তাকে জ্বালানির চূড়ান্ত অবস্থা সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম ।‘আপনি আমাদের করাচিতে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারবেন’?
‘আমরা এখন মাঝপথে । আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি । তবে স্যার, আপনাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে । ফিরতি পথে যদি সামান্যতম কোনো সমস্যা হয় তবে আমরা বিধ্বস্ত হবো’।
‘তারপরও করাচিতেই ফিরে চলুন’। আমি বললাম । পরবর্তী কয়েকটি মুহুর্ত ছিলো দুঃসহ উদ্বিগ্নতার । পরতে পরতে বিপদের সমুহ সম্ভবনা । একটুখানি অমনোযোগ কিংবা বাতাসের গতি পরিবর্তন অথবা অন্য কোনো সামান্যতম প্রতিকূলতায় আমরা বিধ্বস্ত হবো । মাত্র ৭ মিনিটের জ্বালানি থাকা অবস্থায় আমরা অবশেষে অবতরণ করলাম । কোর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল উসমানী, বিভাগীয় কমান্ডার ইফতিখার এবং আরো কিছু কর্মকর্তা-সবাই রুদ্ধশ্বাসে অপেক্ষা করছিলেন । আমার শুধু এটাই মনে হলো-আমি মৃত্যর মুখ থেকে ফিরেছি । আমি বেঁচে আছি । এর চেয়েও বেশি সুখের বিষয় সেহবা এবং বিমানের অন্যান্য যাত্রী, বিশেষ করে নিষ্পাপ শিশুরা নিরাপদ অবতরণ করতে পেরেছে ।এই শ্বাসরুদ্ধকর নাটকীয় স্মৃতি আমার মনে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে ।
সুত্রঃ In The Line Of Fire (সংক্ষেপিত)
Parvez Mosharraf
বিঃদ্রঃ এসব কথা মানুষ বানিয়ে লিখে ? আমার আগের এক পোষ্টে এক ভদ্রলোক কমেন্ট করেছিলো এই বই নাকি সিআইএ কম্পোজ করেছে । আমি তাকে কিছু বলিনি । তবে তাকে ব্লক করবো কাল । আমি চাই এই পোষ্ট সে পড়ুক । কিছু চেংড়া পোলা কয়েকটা পাঠ্যপুস্তক পড়ে বিএ, এমএ পাশ করে নিজেকে কি যে ভাবে ? তাদের জন্য সত্যি করুণা হয় । আমি যদি পারভেজ মোশাররফ হতাম তবে ল্যান্ড করার ১ ঘন্টার মধ্যে নওয়াজ শরিফের পুরো ফ্যালিলিকে মিসাইল মেরে উড়িয়ে দিতাম । খলনায়ক নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে পারভেজ মোশাররফ ক্যু করেনি । তার অনুপস্থিতিতে সেনাবাহিনীই ক্যু করেছিলো । ভুপেন একটু লেখা পড়া করো । ফেসবুকে একাউন্ট খোলে আতলামি করো না ।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন