তার ইতিহাস
(আমেরিকায় ছিলাম বলে অনেকেই মাঝে মাঝে কিছু জানতে চান।গতকাল রাজশাহীর বন্ধু কাকন কাজী ইনবক্সে লিখেছেন ‘করিম, আপনি আমাকে হ্যালোউইন ডে সম্পর্কে কিছু জানাতে পারেন । আমি আমার হাসব্যান্ডকে বলবো।’
এ সব বিষয় পাবলিকলি লিখতে গেলে পড়তে হয়, তথ্য কালেকশান করতে হয়। চেষ্টা করেছিলাম তার ইনবক্সে দিতে কিন্তু যতবারই চেষ্টা করেছি ততোবারই দেখাচ্ছে Message too long, can not send. তাই এখানেই দিলাম।কোথাও ভুল থাকলে আমেরিকা ও কানাডার বন্ধুরা সংশোধনী দিতে পারেন।চার বছর আগের লেখা। )
যেই ক্যালেন্ডারের পাতায় অক্টোবর মাস এলো অমনি সারা আমেরিকায় হ্যালোউইন উৎসব পালনের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেলো।এটি এমন একটি উৎসব, যার সঙ্গে জড়িত ভূত-প্রেত । প্রতিবছর অক্টোবরের শেষ দিনটি অর্থাৎ ৩১ তারিখ মৃত আত্মাদের স্মরণে পালিত হয় এ দিবস । বিগত কয়েক বছরে পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের অলিগলির প্রায় সর্বত্রই হ্যালোইন ডে পরিচিতি পেয়েছে । এই হ্যালোইন ডে-র উৎপত্তি কোথায় তা কি কেউ জানেন ?
হ্যালোইন’ বা ‘হ্যালোউইন’ শব্দটি এসেছে স্কটিশ ভাষার শব্দ ‘অল হ্যালোজ’ ইভ থেকে। হ্যালোইন শব্দের অর্থ ‘শোধিত সন্ধ্যা বা পবিত্র সন্ধ্যা’। সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে ‘হ্যালোজ’ ইভ’ শব্দটি এক সময় ‘হ্যালোইন’-এ রূপান্তরিত হয়।
প্রায় দুই হাজার বছর আগে বর্তমান আয়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড ও উত্তর ফ্রান্সে বসবাস করতো কেল্টিক জাতি । নভেম্বরের প্রথম দিনটি তাদের নববর্ষ বা ‘সাহ-উইন’ হিসাবে পালন হতো।এই দিনটিকে তারা গ্রীষ্মের শেষ এবং অন্ধকারের বা শীতের শুরু মনে করতো।আর অক্টোবরের শেষ একটি দিনকে মনে করতো সবচেয়ে খারাপ রাত, যেই রাতে সকল প্রেতাত্মা ও অতৃপ্ত আত্মা তাদের মাঝে ফিরে আসে।এদের সঙ্গে যদি মানুষের দেখা হয় তবে সেই মানুষের ক্ষতি হতে পারে।আর তাই মানুষরা এই রাতে(এখন দিনেও) বিভিন্ন রকম ভূতের মুখোশ ও কাপড় পরে কাটাতো।আর রাতের বেলা আগুনের পাশে মুখোশ পরে বৃত্তাকারে একসঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে মন্ত্র বলা, নিজের পরিবার ছোট হলে অন্যের বাড়িতে থাকাসহ সামাজিক ভাবে একত্র হতো। সময়ের পরিক্রমায় কেল্টিক জাতির এই ‘সাহ-উইন’ উৎসবই এখনকার দিনের ‘হ্যালোইন’ উৎসব। এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে দুটো ব্যাপার জড়িত। একটা হল ট্রিক অর ট্রিট, আর আরেকটি হল জ্যাকের বাতি ল। ছোট ছোট বাচ্চারা বাড়ি বাড়ি ঘুরে আর দরজা নক করে বলে ট্রিক অর ট্রিট, তখন আপনার দায়িত্ব হচ্ছে তাদের ঝুলিতে কিছু ক্যান্ডি বা খাবার দাবার দিয়ে দেয়া।
অক্টোবরের ৩১ তারিখ মৃতের দেবতা সমান সব মৃত আত্মাদের পৃথিবীতে আহ্বান জানান।ওইদিন উড়ন্ত ঝাড়ুতে করে হ্যালোইন ডাইনি সারা উড়ে বেড়ায় আকাশ জুড়ে।কখনোবা সবুজ খরখরে দেহের ডাইনি বুড়ি কড়া নাড়ে কোনো বাড়ির দরজায়।হ্যালোইনের দিনটি সম্পর্কে লোকজ ধারণা এটি।
যত ভূত-প্রেত আছে,সবাই নাকি এ রাতে চলে আসে লোকালয়ে।আর সেই সব ভূত-প্রেতদের খুশি করতে না পারলে তো বিপদ!আর সে জন্যই এই রাতটিতে পালন করা হয় হ্যালোইন উৎসব। অক্টোবর মাসের শেষ দিনে এই হ্যালোইন পালন করা হয়।এই হ্যালোইন পালন করা নিয়ে ইউরোপ-আমেরিকায় মাতামাতির শেষ নেই। রাতটি উদযাপন করতে সেখানে প্রস্তুতি চলে মাসজুড়েই।এখন তো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই হ্যালোইন পালিত হয়। ইউরোপ-আমেরিকায় তো বটেই, পালিত হয় জাপানে, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডেও ।
প্রতি বছর ৩১ অক্টোবর শীতের হিমেল হাওয়ায় দিনের আলো শেষ হতে হতে কম বয়সী ছেলেমেয়েরা টর্চ হাতে দল বেঁধে বেরিয়ে পরে ট্রিক অর ট্রিট করার জন্য।ছোট ছোট বাচ্চারা বাসায় বাসায় গিয়ে দরজায় কড়া নেড়ে বলে ট্রিক অর ট্রিট।হয় তোমাকে নিয়ে কোনো ট্রিক করা হবে অথবা ট্রিট দাও! আর রেওয়াজ মতো অনেকেই মুখে মুখোশ এঁটে গায়ে অদ্ভুত পোশাক পরে বেরিয়ে পরে।যেমন খুশি তেমন সাজোর মতো কেউ বা রাজকুমারী, প্রজাপতি বা উইনি দ্য পু-এর টিগার সাজতে ভালোবাসে।সারা সন্ধ্যা ছেলেমেয়েরা বাড়ি বাড়ি যায়,বিভিন্ন দোকান ও ডিপার্টমেন্ট স্টোরেও যায়,সংগ্রহ করে আনে ব্যাগ ভর্তি চকলেট।সব বাড়িতেই বাচ্চাদের জন্য চকলেট রাখা হয়।এই একটি দিন আমেরিকায় বিনা দ্বিধায় যে কারও বাড়ির আঙিনায় যাওয়া যায় আর অনায়াসে বাড়ির কড়া খটখটালেও কেউ আপত্তি জানায় না।
হ্যালোউইনের সময় নিউইয়র্ক সিটির একটি অন্যতম আকর্ষণ হলো গ্রিনিজ ভিলেজ হ্যালোউইন প্যারেড।১৯৭৪ সাল থেকে ৪১ বছর ধরে নিউইয়র্ক সিটির ডাউন টাউনে অবস্থিত গ্রিনিজ ভিলেজ হ্যালোউইনের ঐতিহ্যবাহী প্যারেড অনুষ্ঠিত হচ্ছে।প্রতি বছর বিভিন্ন পেশার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষ বিচিত্র পোশাকে এই প্যারেডে অংশ নেন।এ ছাড়াও লক্ষাধিক মানুষ রাস্তার দুই ধারে দাঁড়িয়ে এই প্যারেড উপভোগ করেন।অনেক টিভি চ্যানেল অনুষ্ঠানটি সরাসরি প্রচার করে।এই প্যারেডে সাধারণ মানুষ ছাড়াও থাকে অনেক অভিনেতা,গায়ক-গায়িকা,নৃত্য শিল্পী,সার্কাসের কলাকুশলী ও পুতুল নির্মাতা অংশ নেন।প্যারেডে অনেকে গান ও অভিনয়ের দল লাইভ পরিবেশনাও করেন।
দুঃখের কথা হলো বাঙালি অধ্যুষিত কোনো এলাকায় আপনি হয়তো খুব একটা হ্যালোউইনের সাজসজ্জা দেখবেন না।এটা দেখতে আপনাকে যেতে হবে অন্যান্য এলাকায়।তবে হ্যালোউইনের দিন সন্ধ্যায় বাচ্চারা ঠিকই বেরিয়ে পড়ে ক্যান্ডি সংগ্রহে।
দিনটি এমনকি ঘটা করে পালন করে ইউনিসেফও ।তাদের সঙ্গে যুক্ত শিশুদের অনেকেই এদিন ভূত সেজে ট্রিক অর ট্রিট খেলার ছলে সংগ্রহ করে তহবিল।আর সে তহবিল খরচ হয় অসহায় শিশুদের জন্য।
বিঃদ্রঃ আমেরিকায় দেখেছি সকাল থেকেই শুরু হয় এই অনুষ্ঠান।
©Karim Chowdhury
October 5, 2016
Cumilla.
( এপি,এএফপি ও টাইম ম্যাগাজিন অবলম্বনে। )



মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন