সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধ

 আমার দেখা মুক্তিযুদ্ধ


------------------------------

করিম চৌধুরী


(স্বাধীনতার মাস। তাই অনেক আগের লেখাটি প্রাসঙ্গিক বলে ফেইসবুক বন্ধুদের জন্য)। 


শ্লেটে চকের দাগ ভেজা কাপড়ে মুছে ফেলা যায়। কাগজে পেন্সিলের লেখা রাবার ঘষে উঠিয়ে ফেলা যায়। কিন্তু মানুষের জীবনে এমন কিছু ঘটনা বা স্মৃতি থাকে যা কখনোই, কিছুতেই মুছে ফেলা যায় না। উঠিয়ে ফেলা যায় না। সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় বটে। কিন্তু থেকে যায় স্মৃতি। সময়কে পরাজিত করে বার বার সে জেগে উঠে। হতে পারে সেই স্মৃতি সুখের, দু:খের, আনন্দের, বেদনার, হাস্যকর, লজ্জাকর, রোমাঞ্চকর, মধুর বা ভয়ঙ্কর স্মৃতি। মনে হতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে অবিকল। স্মৃতির মুখচ্ছবিতে কখনো কালের মালিন্য লাগে না।


কৈশোরের প্রথম প্রেমের মধুর স্মৃতির মতোই শৈশবেও আমার এক ভয়ঙ্কর স্মৃতি আছে।

স্পষ্ট মনে আছে। তখন ক্লাশ থ্রিতে পড়ি। ১৯৭১ সাল। বলাইবাহুল্য, সারাদেশে থমথমে ভাব, সবার মধ্যে আতংক। যুদ্ধ অলরেডি শুরু হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধকে তখনো ‘গন্ডগোল’ বলেই জানি। সবাই বলতো দেশে 'গন্ডগোল' লাগছে। আমাদের গ্রামের বাড়ির লোকেশনটি ভালোই বলা যায়। কুমিল্লা সেনানিবাসের এক মাইল পূর্বে এবং শহরের এক মাইল পশ্চিমে। শহরের কিছু অংশ আবার আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্ভূক্ত। বাড়ির এপ্রোচিঙে লাগোয়া পূর্ব দিকে বড় মসজিদ-বাড়ি ঘেষা দক্ষিণ দিকে বিশাল পরিচ্ছন্ন পুকুর। পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের উপর আজো দেখা যায় সেনানিবাসে লোকাল এরিয়া কমান্ডার বা জিওসি’র (জেনারেল অফিসার কমান্ডিং) সরকারি বাসভবন ‘ফ্লাগ ষ্টাফ হাউস’।


বড় ভাই মিলিটারি পার্সোনেল হওয়ায় আর্মির প্রতি ডরভয় ছিলো না কখনোই। ঘরের মধ্যে মিলিটারি বলে কথা। সেনানিবাসের ভেতরে আর্মি সিনেমা হল ‘গ্যারিসন’- এ বড়দের সঙ্গে সিনেমা দেখা আর কারণে অকারণে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে যাওয়া আসার জন্যে আর্মি ভীতি আমাদের কখনোই ছিল না, এখনো নেই।


কিন্তু ভাইয়া, ভাবী বাচ্চাদেরকে ঢাকা থেকে কৌশলে বাড়িতে পাঠিয়ে নিজে পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে ইন্ডিয়ায় চলে যান এবং মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। ওই সময় ভাইয়া টিক্কা খানের ডিউটিতে ছিলেন। ভাইয়া এখনো বেঁচে আছেন। বয়স ৮৫। নাম মালেক চৌধুরী। তখন আমরা খুশি হলেও দু:চিন্তায় পড়ি। চাচাতো ভাইও আর্মি পার্সোনেল। আটকা পড়েছেন রাওয়ালপিন্ডি। ভাইয়া ইঞ্জিনিয়ার্স কোরে আর চাচাতো ভাই আর্টিলারিতে। মা, চাচী আম্মার মন খুবই খারাপ। প্রায়ই কান্নাকাটি করেন। সব কিছু মিলে একটা বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। দাদীরা তখন থেকেই পাকিস্তান আর্মিকে খান সেনা বলা শুরু করেন। না বুঝে দাদীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। দাদী বলেছিলেন- ‘এই সৈন্যরা আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান, টিক্কা খানের পক্ষে। এর লাইগ্যা তারারে কই খান সেনা।’


এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে সশস্ত্র খান সেনারা নামলো আমাদের গ্রামে। গ্রামে আমরা তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী এবং বাড়ির আলাদা নাম থাকায় প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে গ্রামের মানুষ এসে জড়ো হতেন আমাদের বাড়িতেই। প্রথম দিন একজন ক্যাপ্টেনের নেতৃত্বে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বেশ কিছু ননকমিশন্ড অফিসার ও জওয়ান পুরুষদেরকে পুকুর পাড়ে জড়ো করে। আর কিছু সৈন্য মহিলাদেরকে বাড়ির বড় উঠোনে জড়ো করে। আমরা স্কুলে পড়ুয়া বালকরা মহিলাদের দলেই থাকতাম। মহিলারাও চাইতেন আমরা যেন তাদের সঙ্গেই থাকি। পরে বুঝেছি কেনো?

একজন হাবিলদার উর্দুর সঙ্গে বাংলা মিশিয়ে মহিলাদের উদ্দেশ্যে ছোট্ট বক্তৃতা দিলো। যার মর্মার্থ-কোনো মুক্তিবাহিনী এবং হিন্দুর খবর পেলে তাদের জানাতে হবে। কেউ যেনো মুক্তিবাহিনীতে না যায়। ওঁরা দুস্কৃতকারী। হিন্দুরা এই দেশের শত্রু।

এসব খবরাখবর তাদের না জানালে সবাইকে মেরে ফেলবে। আমাদের এক চাচী হাবিলদারের কথা শেষ না হতেই দুই হাত উপরে তোলা অবস্থায় অস্থিরভাবে অসহায়ের মতো বললেন- ‘আল্লাহর হুকুম বাবু খবর দিমু। আল্লার হুকুম কইলাম’।

হাবিলদার চাচীকে ধমক দিয়ে বললো- ‘আরে বেটি সবুর কর’। এরপর থেকে চাচী আমাদেরকে কোনো কাজ করতে বললে আমরা চাচীকে রাগানোর জন্য বলতাম-

‘আরে বেটি সবুর কর।’

চাচী বলতেন- ‘বাবারে ঐ সময় কলিজায় পানি ছিলো না’।


ধমক টমক দিয়ে সেদিন পাক সেনারা চলে গেলো।

এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিন সকাল নয়টা দশটায় খান সেনারা সশস্ত্র অবস্থায় আমাদের এলাকায় আসতো। কারো কাঁধে এস.এম.জি, কারো কাঁধে এস.এল.আর, কারো কাঁধে ষ্টেশনগান, কারো কাঁধে থ্রি নট থ্রি রাইফেল। ষোলো থেকে পঁয়ত্রিশ বছরের কোনো নারী-পুরুষ সে সময় এলাকায় পাওয়া ছিল অবিশ্বাস্য ব্যাপার। খান সেনারা আসছে শুনলেই সবাই নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতেন। চল্লিশোর্ধ পুরুষসহ দাদী, মা, চাচীর মতো বয়স্ক মহিলা এবং আমরা বালক ও শিশুরা ছাড়া এলাকায় আর কেউ থাকতো না। পাকিস্তানী গোঁফওয়ালা দশাসই শরীরের খান সেনাদের কথা শুনলেই মুরুব্বীসহ শিশুরা পুকুর পাড়ে জড়ো হতাম। মুরুব্বীরা আগে থেকেই পরিকল্পনা এঁটেছেন যেনো পাকিস্তানিরা বাড়িতে ঢুকতে না পারে। পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে মুক্তিবাহিনী ও হিন্দুদের খবর নেয়ার পর তাদের ফরমায়েস কিছু মুরগী দিতে হবে। বেশ। মুরুব্বীদের নির্দেশে সিক্স, সেভেনে পড়ুয়া চাচাতো ভাইয়েরা মুরগী ধরতে ব্যস্ত। ঘন্টা খানেক দৌঁড়ানোর পর সাত আটটি মুরগী ধরে তাদের দেয়া হলো। 


এবার প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে পাকিরা আসে। সিনিয়র ভাইয়েরা মুরগী ধরার প্রস্তুতি নেন। এখন বুঝি তাদের সাপ্লাই লাইন বন্ধ হয়ে গিয়েছিলো। খাবার সংকট। অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে, খান সেনারা আসছে শুনলে এখন কেউ আর তেমন আতঙ্কিত হয় না। যুবক যুবতীরা নিরাপদে চলে গেলেও মা, চাচী, দাদীসহ অনান্য বয়স্ক পুরুষ মুরুব্বীরা দিব্বি আছেন। যন্ত্রণা সব আমাদের, ইমিডিয়েট সিনিয়র ভাইদের। সঙ্গে আমরাও দৌঁড়াদৌঁড়ি করি। পাকিদের মুরগী চাই। যেহেতু স্কুলে যাওয়ার কোন বালাই নেই। কাজেই আমরা সারাক্ষণ বাড়িতে। বেশ কয়েকদিন পর দেখা গেল এলাকায় মুরগী আর নেই। আছে শুধু মোরগ। মোরগকে আমরা স্থানীয় ভাষায় বলি ‘রাতা’। পরদিন ছিনতাইকারীরা আবার হাজির। ঘন্টা দেড়েক দৌঁড়ানোর পর নিষ্পাপ বালকরা তিনটি মোরগ নিয়ে হাজির হলো। ডাকাতরা মোরগ নেবে না। তাদের মুরগী চাই। চাচা বললেন-মোরগগুলো ছেড়ে দিয়ে মুরগী ধরে আনতে। সিক্সে পড়ুয়া চাচাতো ভাই বালকসুলভ সারল্যে জেদ নিয়ে গ্রামের ভাষায় বলে ফেললো-

‘আমি পারতাম না, মুরগী কি বানাইয়া দিমু? হেরার বাপের চাকর পাইছে নাকি? ডেইলি ডেইলি আইসা কইবো আর মুরগী ধইরা দিমু’।


হরতনের গোলামের মতো গোঁফওয়ালা একজন পাক সেনা ওর দিকে তাঁকাতেই সে এমন একটা দৌঁড় দিল-ভাবতে আজো অবিশ্বাস্য মনে হয়। এখনো কোনো আন্তর্জাতিক টুর্ণামেন্ট বা অলিম্পিকে দৌঁড় প্রতিযোগিতা দেখলে আমার হাসি পায়। সেরকম দৌঁড় যদি চাচাতো ভাই অলিম্পিকে দিতে পারতো নিশ্চিত সে ফার্ষ্ট হতো। দ্রুততম বালক।


এভাবেই চলতে লাগলো। বরং পাকিস্তানীরা কোনো দিন না এলে মুরুব্বীরা চিন্তিত হয়ে পড়তেন। আমরা সঙ্গীতপ্রিয় বালকরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের

‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি’।

 ‘সোনা সোনা সোনা-লোকে বলে সোনা-

সোনা নয় ততো খাঁটি, 

বলো যতো খাঁটি তার চেয়েও খাঁটি 

বাংলাদেশের মাটি’ ইত্যাদি গান শুনে দিব্বি সময় কাটাই।


বেশ কয়েকদিন পর দুপুর বেলা সবাই মিলে পুকুরে গোসল করছি। আকাশ মেঘে ঢাকা। সেনানিবাস সংলগ্ন পাশের গ্রামে কয়েকটি বোমা বিস্ফোরণের শব্দে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। একটু পর পর গুলির শব্দ। মুরুব্বীদের নির্দেশে পুকুর পাড় ছেড়ে সবাই বাড়ীর ভেতরে চলে গেলাম। কিছুক্ষণ পরই গ্রামের অন্যান্য বাড়ি থেকে লোকজন আমাদের বাড়িতে আসতে শুরু করলো। ভয় মেশানো কন্ঠে অস্থিরভাবে অসহায়ের মতো ওরা বললো, গ্রামে প্রচুর মিলিটারি নেমেছে। আমাদের গ্রাম চারদিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। পালানোর কোন ব্যবস্থা নেই। নিশ্চিদ্র নিরাপত্তার মতোই নিশ্চিদ্র ঘেরাও।


পুকুর পাড়ে, ধান ক্ষেতে, সামনে, পেছনে সশস্ত্র মিলিটারি। এখনো বাড়িতে ঢুকেনি। বাড়ির ভেতরে অবরুদ্ধ মুরুব্বীরা তাৎক্ষণিকভাবে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিলেন-

বড় চাচা এই মুহূর্তে গুরুতর অসুস্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকবেন। বেশ কিছু প্রাপ্ত বয়স্ক নারী পুরুষ হাতে ওষুধ এবং পানি নিয়ে তাঁর সেবায় নিয়োজিত থাকবেন। একজন ডাক্তার সেজে তাঁর চিকিৎসা করবেন। অন্যান্য কয়েকজন পাশে বিছানা পেতে কোরআন তেলাওয়াত করবেন। মহিলারা পাশের ঘরে বসে গুন গুণ করে কাঁদবেন। কয়েকজন টুপি পড়ে নামাজের উদ্দেশ্যে মসজিদে যাবেন পাকিস্তানীদের সামনে দিয়েই। আর তাগড়া তাগড়া যুবক, যাদেরকে মনে হতে পারে মুক্তিযোদ্ধা, ই.পি.আর (ইষ্ট পাকিস্তান রাইফেলস), সশস্ত্র বাহিনী থেকে পালিয়ে এসেছে, তারা বিভিন্ন ঘরে সিলিং এর উপর এবং বাড়ির পেছনে লম্বা লম্বা কচুরিপানায় ভর্তি বেশ বড় একটি পরিত্যক্ত ডোবায় শুধু নাক উপরে রেখে ডুবে থাকবেন। এই ডোবায় অনায়াসে পঞ্চাশ ষাটজন লোক লুকিয়ে থাকতে পারে। স্থানীয় ভাষায় এই ডোবাকে আমরা বলি ‘কুয়া’।


পানিতে ফেলা যা এমন সব নিকৃষ্ট শ্রেণীর আবর্জনা আর বাড়ির সব টয়লেটের মলমূত্রে ভর্তি এই কুয়া। ভাবতেই কেমন গা রি রি করে। কোনো লোক এই কুয়ার পানি পর্যন্ত স্পর্শ করতো না। বড় বড় শিং, মাগুর, কৈ, টাকি, শোল, বোয়াল ইত্যাদি প্রচুর মাছের বসবাস এতে। মাছগুলো পর্যন্ত কেউ খেতো না। এগুলো সব গু খাওয়া মাছ বলে। অথচ আজ মিটিং করে সিদ্ধান্ত নিয়ে সেই কুয়াতেই সবাই নামতে যাচ্ছেন সবাই! জীবনের মায়া বড়ই গুরুত্বপূর্ণ। হাতের ইশারায় মা কাছে ডেকে কানের কাছে ফিশফিশ করে বললেন, ‘তুইও তারার লগে যা’। মায়ের চোখে তাঁকাতেই মা চোখ টিপে মাথা হেলিয়ে নি:শব্দ হাসিতে আবার ইশারা করলেন। অন্যদের সঙ্গে আমরা কয়েকজন বালকও রওয়ানা হলাম। অব্যবহৃত এবং আবদ্ধ পানি তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা হয়। তার ওপর কচুরিপানায় ঠাসা। এই কুয়ার পানি কখনো সূর্যের মুখ দেখেনি বলে আমার ধারণা। বড়দের দেখাদেখি আমরা বালকরাও পাড় ঘেষে সেই নিকৃষ্ট কুয়াতে নামলাম। বেশ ঠান্ডা পানি। উত্তেজনায় প্রথমে খেলায় করিনি। বেশ কিছুক্ষণ পর দেখি আমার ঠিক মুখের সামনে কচুরিপানার শেকড়ের সঙ্গে টয়লেট থেকে আগত প্রচুর ভাসমান মলের উপস্থিতি। আমি ফিশফিশ করে পাশের বড় চাচাতো ভাইকে বললাম। তিনি চাপা কন্ঠে বললেন-‘চুপ, কথা বলিস না’। পাকিস্তানিরা টের পেলে মাইরা ফেলবো। উনার নিষ্ঠুর ব্যবহারে সে সময় মনে হয়েছিলো-মৃত্যু এর চেয়ে ভালো। কাঁদতেও পারছি না।


ঘন্টাখানেক পর মহিলারা ডেকে বললেন-পাকিরা চলে গেছে। হুমমুড় করে সবাই ওঠে বড় পুকুরের দিকে দৌঁড়াতে লাগলেন। আমি কাঁদতে কাঁদতে মায়ের কাছে গেলাম। মা কুয়ার পাড়েই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাও কতক্ষণ কাঁদলেন। মা গরম পানির সাথে ডেটল দিয়ে গালে গাল লাগিয়ে আদর করে গোসল করিয়ে দেন। 


কুয়াতে নামা সিনিয়র ভাইয়েরা কে কেমন ভয় পেয়েছেন, কার ফিলিংস কি রকম ছিলো, পাকিস্তানিরা কুয়াতে দেখে ফেললে কে কি করতেন এসব গল্প করতে করতে মনের আনন্দে গোসল করছেন। টাওয়েল হাতে পুকুর ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা চাচাতো ভাবী ভাইকে বললেন-এখন তো খুব গালাগালি করছো-এই করবো, সেই করবো বলছো-ঐ সময়তো মুরগীর মতো খোয়াড়ে ঢুকেছিলে। চাচাতো ভাই বললেন-যা কিছু করেছি সব তোমার জন্য। নিজের কথা ভাবিনি। আমাকে মেরে ফেললে তুমি বিধবা হবে এই ভেবেই লুকিয়ে ছিলাম। তুমি না থাকলে আমি যুদ্ধ করতাম। মুক্তিযুদ্ধেও যাচ্ছি না শুধু তোমার কারণে। ভয় কেটে গেলে মানুষ যেমন আনন্দ করে ঠিক তেমন। 


সবাই অট্রহাসিতে ফেটে পড়লো। ঠিক সে মুহুর্তে আরেক চাচাতো ভাই একটা রেডিও (ওই সময় আমরা রেডিওকে ট্রানসিস্টার বলতাম) হাতে পুকুর পাড়ে এসে ঘোষকের সুরে বললেন-এখন আপনারা শুনবেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠান। রেডিও অন করতেই গান বেজে উঠলো

'‘সোনা সোনা সোনা-লোকে বলে সোনা-

সোনা নয় ততো খাঁটি

বলো যতো খাঁটি তারচেয়ে খাঁটি 

বাংলাদেশের মাটি"।

(উল্লেখ্য যে, আমাদের ইউনিয়ন পরিষদের কোনো গ্রামে পাকিস্তানিরা কাউকে হত্যা করেনি। এবং কোনো মহিলাকে রেইপ করেনি।)


©করিম চৌধুরী

কুমিল্লা, বাংলাদেশ 

১৪. ১২. ২০০৪

দৈনিক ভোরের কাগজ- এ প্রকাশিত।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অশ্লীল নাম

বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠান ও স্থানের বিচিত্র বা বিকৃত অর্থের নাম যা পরিবর্তন করা উচিতঃ ১. বোদা মহিলা মহাবিদ্যালয়, বোদা, পঞ্চগড় ২. চুমাচুমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাঙ্গামাটি ৩. সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খুলনা ৪. মানুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নীলফামারি ৫. সোনাকাটা ইউনিয়ন, তালতলী, বরগুনা ৬.বড়বাল ইউনিয়ন, মিঠাপুকুর, রংপুর ৭.সোনাখাড়া ইউনিয়ন, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ৮. ধনকামড়া গ্রাম, ভোদামারা, দিনাজপুর ৯.গোয়াকাটা, দোহার, ঢাকা ১০. গোয়াতলা, ময়মনসিংহ ১১.লেংটার হাট, মতলব, চাঁদপুর

বোতল

বোতল মানব জীবনে বোতল অপরিহার্য । বোতল অনেক অর্থেও ব্যবহার হয় । কোনো কোনো এলাকায় আনস্মার্ট, বেয়াক্কেল প্রকৃতির লোককেও বোতল বলা হয় । ইউরোপ আমেরিকায় থাকতে আমি ডৃংক করতাম । হার্ড ডৃংক কমই খেতাম । প্রতিদিনই বিয়ার খেতাম । বিয়ার স্বাস্থ্য ভালো রাখে ও কাজ করতে এনার্জি জোগায় । পরিমিত বিয়ার খেলে কেউ মাতাল হয় না । মাঝে মাঝে বিশেষ কোনো পার্টিতে হুইস্কি খাওয়া হতো । তাও দামি ব্র্যান্ডের । জনি ওয়াকার ব্ল্যাক লেবেল, টিচার্স, পাসপোর্ট, হেনেসি, শিভাস রিগাল, জ্যাক ড্যানিয়েলস । সাকুরায়ও অনেক সময় এসব ব্র্যান্ডের হুইস্কি পাওয়া যায় না । তো দেশে আসার পরও কিছু দিন ডৃংক করেছিলাম । কুমিল্লায় সরকার অনুমোদিত একটা মদের দোকান আছে চক বাজারে । নামঃ নাদের ট্রেডিং কোং । এটা প্রায় আজ ৫০ বছর । এখানে বিদেশি ব্র্যান্ডের ডৃংক পাওয়া যায় না । দেশিয় কোম্পানি ‘কেরো এন্ড কোং’ যা দর্শনায় অবস্থিত তার তৈরি ভদকা, হুইস্কি, জিন পাওয়া যায় । আমাদের সমাজতো রক্ষনশীল । তাই কান্দিরপাড় থেকে একটা স্প্রাইট কিনে অর্ধেক খেতে খেতে চক বাজার যেতাম । নাদেরে যখন পৌঁছতাম তখন স্প্রাইটের বোতল অর্ধেক খালি হয়ে যেতো । আমি বাবুল ভাইকে স্প্...

আমার দেখা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ

আমার দেখা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ সরকারঃ শেখ মুজিবের শাসনামল ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের মার্চে শুরু হয়ে সেই বছরেরই ডিসেম্বরের দিকে গিয়ে শেষ হয়। এই দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল। এই দুর্ভিক্ষকে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক হিসেবে গন্য করা হয়। ওই সময় আমি বুঝতাম। ক্লাশ ফোরে পড়তাম। আহারে ! কি যে অভাব ! অনেকের মতো আমরাও ভাত না খেয়ে রুটি খেয়েছি । তাও পরিমিত । কখনো জাউ খেয়েছি । শুকনো মরিচ পাওয়া যেতো না । কাঁচা মরিচের কেজি ছিলো ১৫০ টাকা । লবন ১২০ টাকা । আর সোনার ভরি ছিলো তখন ১৫০ টাকা । সোনা শুধু ওই সময় কম দাম ছিলো । চারদিকে অভাব । সারাদেশের মানুষের হাহাকার । কতো মানুষ না খেয়ে মারা গেছেন ! বিদেশি রিলিফ সব আওয়ামী লীগের লোকেরা চুরি করেছে । আর বেশিরভাগ রিলিফ সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে পাচার হয়েছিলো । তখন বর্ডার খোলা ছিলো তখন । মহিলাদের শাড়ি কাপড় ছিলো না । অনেকে মাছ ধরার জাল পরে লজ্জাস্থান ঢেকেছিলো । এসব ছবি পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছিলো । কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো অভাব ছিলো না । বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুই বছর তিন মাসের মাথায় ...