আমেরিকান সিসটেম
------------------------------
করিম চৌধুরী
শেল অয়েল কম্পানির একটি গ্যাস ষ্টেশনে শিফট ম্যানেজার হিসেবে চাকরি করি। প্রাসঙ্গিক কারণে এই চাকরি ও বিজনেসের বর্ণনা দেয়া দরকার।
অনেক বড় এলাকা নিয়ে সেলফ সার্ভিস এই গ্যাস ষ্টেশনে বারোটি পাম্প আছে। চব্বিশটি গাড়ি একসঙ্গে তেল নিতে পারে। পাশে অর্থাৎ এমপ্লয়িরা যেখানে কাজ করে সেটি বেশ বড় একটি ষ্টোর এবং ভেতরে দুটো অফিস রুম। বাইরে বিশ/পঁচিশটি গাড়ি একসঙ্গে পার্ক করার জায়গা। শুধু তেল নেয়ার জন্যই ক্রেতারা এখানে আসে না। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসও কিনতে আসে।
পাম্প থেকে তেল নেয়ার জন্য নজল (Nozzle) বা তেলের পাইপ হাতে নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের ক্যাশ রেজিষ্টারের মনিটরে পাম্প নাম্বারসহ Call লেখা উঠবে। একই সঙ্গে কী-বোর্ডে পাম্প নাম্বারের বাটনে অর্থাৎ সাত নাম্বার পাম্প হলে সাত নাম্বার বাটনে লাল বাতি ফ্ল্যাশ করে বিপটোন বাজবে। সেলস অ্যাসোসিয়েট কী-বোর্ডের অথরাইজ বাটনে টিপলে পাম্প অথরাইজড হবে এবং কাষ্টমার তার ইচ্ছা মতো এমাউন্টের তেল নিতে পারবে। ফিউয়েল ট্যাঙ্ক ভরে গেলে অটোম্যাটিক পাম্প বন্ধ হয়ে যাবে। কাষ্টমার ভেতরে এসে পাম্প নাম্বার বললে সেলস অ্যাসোসিয়েট কী-বোর্ডে উল্লিখিত পাম্প নাম্বার তারপর Fuel লেখা বাটনে টিপলেই কতো গ্যালন তেল নেয়া হয়েছে, প্রতি গ্যালনের দাম কতো, সর্বমোট কতো ডলার তা মনিটরে এবং কাষ্টমার ডিসপ্লে বোর্ডে দেখা যাবে।
কোনো কোনো সময় সেলস অ্যাসোসিয়েট পাম্প অথরাইজ করে না। কারণ কিছু যুবক তেল নেয়ার পর টাকা না দিয়ে জোরে গাড়ি চালিয়ে চলে যায়। সেক্ষেত্রে কিছুই করার থাকে না। এ ধরণের ঘটনাকে অর্থাৎ কেউ তেল নিয়ে টাকা না দিয়ে চলে গেলে বলা হয় ড্রাইভ অফ (Drive Off)।
এই গ্যাস ষ্টেশনে পাবলিক অ্যাড্রেস সিসটেম আছে। অর্থাৎ ভেতর থেকে মাইক্রোফোনে বাইরে কথা বলা এবং বাইরে প্রতিটি পাম্পের সঙ্গে একটি বাটন আছে যা টিপে ভেতরের লোকদের সঙ্গে কথা বলা যায়। কোনো উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির যুবক দেখলে এবং সে ড্রাইভ অফ করতে পারে অনুমান হলে সেলস অ্যাসেসিয়েট মাইক্রোফোনে বলে দেয় Please Prepay বা আগে টাকা দাও।
ভেতরে এসে বা পাম্পে ক্যাশ ডলার, ক্রেডিট কার্ড, ডেবিট কার্ড ঢুকিয়ে তেল নেয়া যায়। এক্ষেত্রে কাউকে ভেতরে আসতে হয় না। পাম্পে টাকা ঢুকালে অটোম্যাটিক পাম্প অথরাইজড হবে এবং যতো টাকা পাম্পে দেয়া হয়েছে ঠিক ততো টাকার তেল নেয়ার পর পাম্প অটো বন্ধ হয়ে যাবে। অনেকে পাম্পে ডলার, ক্রেডিট কার্ড দিয়ে তেল নিলেও বেশির ভাগ কাষ্টমার তেল নেয়ার পর ভেতরে এসে পেমেন্ট দেয়। কারণ আগেই উল্লেখ করেছি এটি বেশ বড় একটি ষ্টোর যেখানে নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক কিছু পাওয়া যায়। শুধু গাড়ির তেল নেয়ার জন্যই লোকজন আসে না। তেল নেয়ার পর প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে একসঙ্গে বিল পে করে দেয়।
এবার ষ্টোরের বর্ণনা। বেশ বড় এই ষ্টোরের সামনের দিকটা সম্পূর্ণ বুলেট প্রুফ কাঁচের অর্থাৎ সামনের পুরো দেয়ালটা কাঁচের। ভেতর থেকে বাইরে সব কিছু দেখা যায়। বাইরে থেকে ভেতরেও। দুটো অটোম্যাটিক স্লাইডিং দরজা। তাও কাঁচের। একটি Entrance বা প্রবেশ আরেকটি Exit বা বাহির। Entrance দরজার সামনে বাইরে থেকে কোনো লোক দাঁড়ালে দরজা খুলবে অর্থাৎ সে ভেতরে আসতে পারবে। কিন্তু ভেতর থেকে কোনো লোক এই দরজার সামনে দাঁড়ালে দরজা খুলবে না অর্থাৎ এই দরজা দিয়ে কেউ বাইরে যেতে পারবে না। তেমনি Exit দরজার সামনে ভেতর থেকে কেউ দাঁড়ালে দরজা খুলবে অর্থাৎ সে বাইরে যেতে পারবে কিন্তু বাইরে থেকে কেউ দাঁড়ালে দরজা খুলবে না। অর্থাৎ এই দরজা দিয়ে কেউ ভেতরে ঢুকতে পারবে না। তবে ম্যানেজমেন্ট ইচ্ছা করলে এই দরজা খোলা এবং বন্ধ করা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। ভেতরের নো এন্ট্রি বাটন টিপে দিলে বাইরে থেকে কোনো লোক দরজার সামনে দাড়ালেও দরজা খুলবে না। তেমনি নো এক্সিট বাটন টিপে দিলে ভেতর থেকে কোনো লোক বাইরে যেতে পারবে না অর্থাৎ দরজা খুলবে না। ষ্টোরের ভেতরে আটটি ক্যামেরা এমনভাবে সেট করা আছে যা কাষ্টমারদের চোখে পড়ে না। এই ষ্টোরে কে এলো আর কে গেল সবই রেকর্ড হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ফ্লোরিডার এই সব গ্যাস ষ্টেশনে প্রায়ই ডাকাতি হয়। আমাদের এখানেও একবার ডাকাতি হয়েছিলো। সেকথা আরেকদিন ছোট করে লিখবো। ডাকাত আমার মাথায় পিস্তল ঠেকিয়েছিলো। কবির আর আমি ছিলাম তখন স্টোরে।
আমি তখন অফ ডিউটিতে ছিলাম। পুলিশ এসে ভিডিও দেখে কয়েদিন পরই ডাকাতদেরকে গ্রেফতার করে। ব্যাংকের পর এ ধরনের ষ্টোরে প্রচুর পরিমাণে ক্যাশ-ডলার থাকে। তাই ম্যাক্সিমাম সিকিউরিটি।
সেন্ট্রালি এয়ারকন্ডিশনড এবং সম্পূর্ণ কমপিউটারাইজড এই ষ্টোরে দুনিয়ার সব ধরনের সফট ড্রিংকস, সব রকমের বিয়ার, রেড ওয়াইন, হোয়াইট ওয়াইন, শতেক রকমের সিগারেট। কিছু সিগারেটের নাম দেখে আমি প্রথম প্রথম অবাক হয়েছি। যেমন নাউ, ভাইসরয়, নিউপোর্ট, মেরিট, ভার্জিনিয়া স্লিম, ভ্যানটেজ, বেসিক, ডুরাল, কার্লটন, সেলিম, মার্লবরো, পার্লামেন্ট, লার্ক, ক্যামেল, লাকি ষ্ট্রাইক, মিষ্টি, মোর-সহ আরো অনেক ব্র্যান্ডের সিগারেট। প্রতিটি সিগারেট তিন চার রকমের। যেমন কোনোটি মার্লবরো, কোনোটি মার্লবরো ১০০ লম্বা সিগারেট, কোনোটি মিডিয়াম, কোনোটি লাইট, কোনোটি মার্লবরো আলট্রা লাইট, কোনোটি মার্লবরো মেনথল, কোনোটি লাইট মেনথল, কোনোটি আলট্রা লাইট মেনথল। মেনথল সিগারেটের ধোঁয়া গলায় গেলে ঠান্ডা বাতাস লাগে।
চিপস, ফাষ্ট ফুড যেমন- চিকেন ফ্রাই, বিফ স্যান্ডউইচ, চিজ বার্গার, হ্যাম বার্গার, গেজার্ট বা মুরগির গিলা-কলিজা ভাজি, টার্কি স্যান্ডউইচ, পিৎসা, কাপুচিনো, কফি, চা। আম, আনারস, আপেল, কলা, কমলা, পেয়ারা, আঙুর, নেকটার, চেরি, ষ্ট্রবেরিসহ সব রকম ফলের কনসেনট্রেটেড জুস। অনেক রকমের বিস্কিট, ফোন কার্ড, কনডম, ব্যাটারি কয়েকশ রকমের ক্যান্ডি, চুইংগাম, মোটর অয়েল, গিয়ার অয়েল, উইন্ডশিন্ড ক্লিনার, গ্লাস ক্লিনার, লিকুইড ব্লিচিং, সাবান, শ্যাম্পু, টয়লেট ও টিশু পেপার, পেপার ন্যাপকিনস, সানগ্লাস, গ্রিটিং কার্ড, ষ্টেট ও রোড ম্যাপ, দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা, দুধ, খাতা-কলম, পেন্সিল, ইরেজার, সুই-সুতা, প্লেয়িং কার্ড, এনভেলপ, অ্যাড্রেস লেবেল, ক্রেজি গ্লু, স্কচটেপ, মার্কিং পেন, হাইলাইট মার্কার, কয়েক রকমের তাজা ফুল (ফ্রিজে রাখা হয়), লাইট বাল্ব, টুথপেষ্ট, ব্রাশ, ডিম, পাউরুটি, দই, চকোলেট, ওষুধ, মেয়েদের প্যাড, বাচ্চাদের খেলনা, ডোনাটস, চিনি, লবণ, নুডলস, প্যাকেট চাল, ক্যামেরা, ফিল্ম, লটো বা লটারি খেলার মেশিন, ফোম কাপ, গ্লাস, প্লেট, ফোলিও, কয়েক রকমের খাবার পানি, আইসক্রিম, বাদাম, পপকর্ণ বা খই, রান্নার তেল। আরো কতো কি! হোয়াট নট!
আরো আছে এটিএম মেশিন বা মিনি ব্যাংক। কারো ক্যাশ ডলারের প্রয়োজন হলে ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড দিয়ে এই মেশিন থেকে টাকা তুলতে পারে। এ ধরনের ষ্টোরকে এখানের স্থানীয় ভাষায় বলে কনভিনিয়েন্ট ষ্টোর। চব্বিশ ঘন্টা খোলা এই গ্যাস ষ্টেশন কাম কনভিনিয়েন্ট ষ্টোরে তিনটি শিফট। সকাল ছয়টা থেকে দুপুর দুইটা ফার্ষ্ট শিফট। বেলা দুইটা থেকে রাত দশটা সেকেন্ড শিফট। রাত দশটা থেকে সকাল ছয়টা থার্ড শিফট। বছরে ৩৬৫ দিনই খোলা।
ভোরে ঘুম থেকে উঠতে পারি না বলে দুইটা থেকে দশটার শিফট কাজ করতাম। ইনশাল্লাহ বলেন আর মাশাল্লাহ-ই বলেন, এ শিফটেই সবচেয়ে বেশি বিজনেস হয়। পাগল, ক্রেজি, মাতাল, উচ্ছৃঙ্খল, বেয়াদব, কাষ্টমারের আসা-যাওয়াও এই শিফটে বেশি। এক ঘন্টা পর পর টাকা গুণে সেফবক্সে ফেলা, খুব ব্যস্ত সময়ে সেলস অ্যাসোসিয়েটসদের সঙ্গে কাষ্টমার সার্ভিস সেন্টারে কাজ করা, ক্রেডিট কার্ড দিয়ে কেউ বেশি ডলারের কেনাকাটা করলে তার আইডি চেক করে ক্রেডিট ব্যুরো বা ব্যাংকে ফোন করে কনফার্মড হওয়া, একটু ময়লা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে তা পরিষ্কার করা, সবাই ঠিকমতো কাজ করছে কিনা সেদিকে খেয়াল রাখা, পনেরো দিন পর পর ইনভেনটরি করা। মোট কথা কোটি কোটি কাজ।
আরেক মহাযন্ত্রণার বিষয় হলো, এ দেশের আইন অনুযায়ী ২১ বছরের কম বয়সী ছেলে মেয়েদের কাছে বিয়ার, ওয়াইনসহ যে কোনো ধরনের অ্যালকোহলিক ড্রিংকস বিক্রি করা এবং ২১ বছরের কম বয়সী ছেলেমেয়েদের কাছে সিগারেট, সিগার, সিগারেট পেপার ও লাইটার বিক্রি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। সিগারেটের প্যাকেটেও লেখা থাকে Underage sell Prohibited . কেউ বিক্রি করলে তা দন্ডনীয় অপরাধ। এই আইনটিকে এখানে বলে Below Violation .সেজন্য এ ধরনের গ্যাস ষ্টেশনে চাকরি করতে হলে সাবধান থাকতে হয়। অনেক সময় অ্যালকোহল ও টোবাকো কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট-এর লোকেরা সাধারণ পোশাক পরে কাষ্টমারের মতো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। এই ডিপার্টমেন্টে-এর লোকেরা উল্লেখিত বয়সের কম বয়সী ছেলেমেয়েদেরকে কাষ্টমার সাজিয়ে ষ্টোরে পাঠায় বিয়ার বা সিগারেট কেনার জন্য। সেলস অ্যাসোসিয়েটস যদি অসাবধানতাবশত আইডি চেক না করে অথবা খুব ব্যস্ত সময়ে আইডি চেক করা উপক্ষো করে বিয়ার বা সিগারেট বিক্রি করে দেয় তাহলেই হয়েছে। বিজনেসের বারোটা বাজিয়ে দেবে ওরা।
যার কাছে বিক্রি করা হয়েছে তাকেসহ ভেতরে এসে যে বা যিনি কাষ্টমার সার্ভিস থেকে বিক্রি করেছেন তাকে প্রশ্ন করবে। অস্বীকার করলে সঙ্গে সঙ্গে রেজিষ্টারের জার্নাল পেপার খুলে তা প্রমাণ করবে । এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো আইটেম বিক্রি করে দাম নিতে হলে তা স্ক্যান করতে হয় এবং সে আইটেমের নাম, দাম ও সময় কমপিউটারে উঠে যায়। কাজেই মিথ্যা বলা বা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। এর ন্যূনতম শাস্তি ১৫০ ডলার জরিমানা আর অস্বীকার করলে অথবা মিথ্যা বলার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করে হাজতে নিয়ে যাওয়া। রায় দেবে কোর্ট।
আমি দুইবার ধরা খেয়েছিলাম। কোর্টেও গিয়েছিলাম। পরে দেখেছি এসব গ্যাস স্টেশনে যারা কাজ করেন তারা সবাই এই ধরা খেয়েছেন। এটাও লিখবো একদিন। এ প্রসঙ্গে আরো উল্লেখ্য, এ দেশে বসবাসকারী প্রত্যেক ইমিগ্রান্ট বা নাগরিকের পকেটে বা ওয়ালেটে আইডি কার্ড থাকে। আইডি কার্ডে ছবিসহ নাম, ঠিকানা এবং জন্ম তারিখ উল্লেখ থাকে। সেলস অ্যাসোসিয়েট অনিচ্ছাকৃতভাবে এমন ভুল করলে ম্যানেজমেন্টকেও হাজারো প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। এমপ্লয়িকে ঠিকমতো ট্রেনিং দিয়েছেন কিনা, কতোদিন ধরে সে এখানে কাজ করে, আপনাদের সিগারেট ও অ্যালকোহল বিক্রি করার লাইসেন্স দেখি ইত্যাদি।
অর্থাৎ এখানে আইনের শাসন আছে। জোর যার মুল্লুক তার সে নিয়ম এখানে বাতিল। মন্ত্রী, এমপি, রাজনৈতিক দলের আর্শীবাদপুষ্ট ছেলেরা, স্ত্রীরা এখানে কারো বাড়ি দখল করে না, কংগ্রেসম্যান, সিনেটরদের স্ত্রীরা ঘুষ খেয়ে পুলিশ প্রশাসনে পছন্দের লোক বসায় না। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, হুমকি-ধামকি এখানে অচল। তবে কিছু কিছু ঘটনা ঘটে। সে জন্য তাৎক্ষণিক বিচারের ব্যবস্থা আছে।
আমাদের এই বিজনেসে অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলেমেয়েরা অনেক সময় গন্ডগোল করে। ২১ বছরের নিচের ছেলেমেয়েরা বিয়ার বা ওয়াইন কিনলে আমরা আইডি দেখতে চাই অথচ তারা আইডি দেখাতে চায় না। আইডি দেখে বয়স কনফার্মড না হয়ে আমরা বিক্রি করি না। সিগারেটের ক্ষেত্রেও তাই। এ নিয়ে সেলস অ্যাসোসিয়েট বা বিক্রয় সহকারীর সঙ্গে এ ধরনের যুবক-যুবতীদের তর্কাতর্কি ও গালাগালি হয়।
একদিন খুব ব্যস্ত সময়ে কাষ্টমার সার্ভিস সেন্টারে দাঁড়িয়ে কাজ করছিলাম। দুইজন যুবক ছয়টার প্যাকেটে মোট বারোটা বাডওয়াইজার (আমেরিকান বিয়ার) নিয়ে কাউন্টারে এসে দাঁড়ালো। মনে হলে ওদের বয়স একুশের নিচে। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আমি যদি তোমাদের আইডি দেখতে চাই, কিছু কি মনে করবে?
ওরা বেয়াদবের মতো আমাকে গালি দিয়ে বললো, ফাক ইউ ম্যান।
আমি বদমেজাজি হলেও দুটো বিয়ারের প্যাকেট কাউন্টার থেকে নিচে নামিয়ে রেখে শান্তভাবে বললাম, ফাক ইউ টু।
এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, এ ধরনের ছেলেমেয়েরা প্রায়ই সেলস অ্যাসোসিয়েটসদের সঙ্গে তর্কাতর্কি করে, গালাগালি করে। এ বিষয়কে কেউ খুব সিরিয়াসলি নেয় না। আমিও নিই না।
ছেলে দুটো আবারো বললো, ইউ ফাকিং ইনডিয়ান।
আমি বললাম, আই অ্যাম নট অ্যান ইনডিয়ান, আই অ্যাম এ ফাকিং বাংলাদেশি।
ছেলে-দুটো তখন বললো, বাংলাদেশ কোথায়? বললাম, স্কুলে গিয়ে তোমার টিচারকে জিজ্ঞাসা করো।
এমন সময় আরো দুটো ছেলে এসে ষ্টোরে ঢুকলো। ওরা বাইরে গাড়িতে অপেক্ষা করছিলো। বন্ধুদের দেরি দেখে ভেতরে এলো। আমি সর্বোচ্চ সতর্কতার প্রস্তুতি নিয়ে তিনজন বিক্রয় সহকারীকে ডেকে বললাম, কাষ্টমার সার্ভিস প্লিজ।
ওরা এসে অন্য দুটো কাউন্টারে দাঁড়িয়ে কাজ শুরু করলো। আমি চার যুবকের সঙ্গে তর্কাতর্কি আর গালাগালিতে ব্যস্ত। একজন আবারো আমাকে গালি দিয়ে বললো, ইউ বিচ অর্থাৎ তুমি কুকুর।
শান্তভাবে বললাম, ইউ টু অর্থাৎ তুমিও ।
চারজনের মধ্যে একজন আমাকে বলে বসলো, ইউ মাদার ফাকার।
এবার আমার খুবই মেজাজ খারাপ হলো। আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, লিসেন, লিসেন ইয়াংম্যান, মাইন্ড ইয়োর ল্যাংগুয়েজ আর মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম, আজ এমন শিক্ষা দেবো-তোমাদের ফরটিন জেনারেশন পর্যন্ত মনে রাখবে। বেয়াদবির একটা সীমা আছে ! উল্লেখ করা দরকার, কাউন্টারের নিচেই একটি ইমারজেন্সি বাটন আছে। এই বাটনে টিপলে সরাসরি পুলিশ ডিপার্টমেন্টের হেড কোয়ার্টারে কল হবে। ফোন করার প্রয়োজন নেই। পুলিশ বুঝতে পারবে এই কল কোথা থেকে এসেছে। ডাকাতি বা গুরুতর দুর্ঘটনার সময় এই সুইচ বাটন টেপার নিয়ম। কেননা ডাকাত বা জঘন্য অপরাধীরা ঢুকেই ফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
লিসেন, লিসেন বলতে বলতে নো এক্সিট বাটন টিপে দিলাম। ভেতর থেকে বাইরে যাওয়ার দরজা বন্ধ হয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে নো এন্ট্রি বা প্রবেশ নিষেধ সুইচও টিপে দিলাম। এখন আর স্টোরে কেউ ঢুকতেও পারবে না আর বেরুতেও পারবে না। শুরু হলো তর্কাতর্কি আর গালাগালি।
একজন সেলস অ্যাসোসিয়েট আমাকে বললো ক্যারিম, ওরা খুবই উচ্ছৃঙ্খল, যে কোনো সময় যে কোনো ঘটনা ঘটাতে পারে, তুমি ওদের সঙ্গে তর্কাতর্কি করো না।
আমি চিৎকার করে বললাম, জাষ্ট শাট আপ, লিভ মি এলোন, লেট মি ডু হোয়াট আই ওয়ান্ট টু ডু।
দরজা বন্ধ করে দিয়েছি। পালাবে কোথায়? সোনা আমার, জাদু আমার, লক্ষ্মী আমার। তুই তোকারি করে গালাগালি শুরু। ইংরেজির পাশাপাশি বাংলা ভাষায় যতো অসভ্য গালি আছে সবই আমার মুখ থেকে বের হলো।
গালাগালি করতে করতেই আমি ইমারজেন্সি বাটন টিপে দিলাম। পাঁচ মিনিটের মধ্যে ওয়াও ওয়াও শব্দে হুইসল বাজিয়ে চারটি পুলিশের গাড়ি এসে হাজির। সুইচ টিপে দরজা খুলে দিলাম। পুলিশ ঢুকতেই সোনামনিরা চুপ হয়ে গেলো। আমি অভিযোগ পুলিশকে বললাম। পুলিশ অত্যন্ত মার্জিত ভাষায় কথা বলে সবাইকে বাইরে নিয়ে গেলো। কিছুক্ষণ পর সবাইকে নিয়ে আবার ভেতরে এলো। পুলিশ আমাকে জিজ্ঞাসা করলো, আপনি কি তাদেরকে ট্রেসপাস (Trespass)এ দিতে চান? অর্থাৎ অনধিকার প্রবেশের অভিযোগ করতে চান?
বললাম নিশ্চয়ই।
পুলিশ তাদের সবার আইডি দেখে নাম, ঠিকানা, জন্ম তারিখ লিখে একটি ফরমে তাদের সই করতে বললো। আর আমাকে জানালো, এরা যদি আর কখনো এখানে আসে তাহলে পুলিশকে ফোন করতে। সঙ্গে সঙ্গে তাদের গ্রেফতার করা হবে।
এ দেশে একটি আইন আছে যার নাম ট্রেসপাস বা অনধিকার প্রবেশ। আপনার বাড়ি, বাসা, ব্যবসা বা অফিসে (হোক তা ভাড়া নেয়া) যদি কোনো ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ দল আপনাকে বিরক্ত করে এবং আপনি পুলিশকে তা জানান তাহলে আপনি যতোদিন সেখানে থাকবেন ততোদিন সেই ব্যক্তি বা সংঘবদ্ধ দল আপনার অধিকৃত জায়গায় আসতে পারবে না।
গত পাঁচ মাসে ওই যুবকদের মুখ আমি দেখিনি। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভাবি, এদেশে যে নিরাপত্তা ও আইনের সুযোগ আমরা পাচ্ছি তা কি আমার প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে পাবো? উল্টো পুলিশই অন্যায়কারীদের পক্ষ হয়ে আমাদের হয়রানি করবে। নয় কি?
© Karim Chowdhury
০৫. ০৯. ২০০০
ফ্লোরিডা
karimcbd@gmail.com
(২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে প্রকাশিত এই লেখাটি খোঁজে পেলাম। বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ার করলাম। ওই সময় আমি শেলে চাকরিরত ছিলাম তাই লেখাটি Present Tense এ লেখা। পড়লে মজাই পাবেন আশা করি। বড় লেখা।)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন