সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মা ও চুল কাটা

 মা ও চুল কাটা


---------------------

মা। চলে গেছেন ২৬ বছর আগে। ১৯৯৭ সালের ২০ আগস্ট। আমি তখন নিউইয়র্কে ছিলাম। মানুষের কতো রকম দু:খ! মার সাথে শেষ দেখা হয়নি। কবরও দিতে পারিনি। অথচ ছোট ছেলে হিসেবে মা আমাকে প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। মার মৃত্যু সংবাদ পাই আমেরিকা সময় ভোর পাঁচটায়। ভাতিজা বাবলু হংকং থেকে ফোন করে। রিসিভ করে হ্যালো বলতেই, 

-কাকা আমি বাবলু।

-ঘুম চোখে বললাম, এই সময় ফোন করেছো কেনো? জানো না সকালে আমার দুনিয়ার ঘুম। 

-কাকা একটা কথা 

- কী?  

-কাকা, উমমম। দাদি মারা গেছেন। 

- কখন? 

-বাংলাদেশ সময় গতকাল বিকেলে। কবর দেয়া হয়ে গেছে। 


আমি আচ্ছা, বলে ফোন রেখে দিই। 


বিছানা ছেড়ে একটা কড়া ব্ল্যাক কফি বানাই। খেতে খেতে মায়ের অনেক স্মৃতি মনে পড়লো। আটটায় ফোন করে অফিসে বললাম, 

-Boss I can't come today. My mother passed away last night. 


-Oh, Karim, I'm sorry. Extremely sorry. May God help you to overcome the sorrow. I pray for your mom. Any problem let me know. 


বড় তিন ভাই বিয়ে করে ফেলেছেন। মার খুব শখ ছিলো আমার বউ দেখার। দেশে থাকতে প্রায়ই বলতেন, তোর যাকে পছন্দ হয় তাকে নিয়ে আয়। আমি মেনে নেবো। রাস্তার ফকিন্নি হলেও আমি মেনে নেবো। তোর পছন্দই আমার পছন্দ। তুইতো আমার ছোট ছেলে। আমার ছোট মেয়ে নাই। তোর বউ আমার মেয়ে হয়ে থাকবে। আমি অনেক আদর করবো তোর বউকে। 

উল্লেখ্য, আমার মা লেখাপড়া জানতেন না। তবে কোনো দিন আমার তিন ভাবীর সঙ্গে ঝগড়া তো দূরের কথা মাকে সামান্য উচ্চ গলায় কথা বলতেও শুনিনি। 


খুব ব্যক্তিত্বশালীনি ভদ্রমহিলা ছিলেন মা। কারো ঘরে যেতেন না। উঠোনে চেয়ারে বসে থাকতেন। কারো প্রয়োজন হলে মার কাছে আসতেন। ওই সময় গ্রামের মহিলারা খালি পায়ে হাঁটতেন। মাকে স্যান্ডেল পরা ছাড়া কোনো দিন দেখিনি। 


এক দিনের কথা মনে পড়ছে। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। শহরে থাকি। বাড়ি-শহর এক কিলোমিটার দূরত্ব। আমার তিন বড় বোন শহরের স্থায়ী অধিবাসী। বড় আপা রেইস কোর্স, মেজো আপা কান্দিরপাড়, ছোট আপা গাংচর। সেদিন আমি বাড়িতে এসেছিলাম। সকালে বাড়ি এলে আবার বিকেলে শহরে চলে যাই। আমার মাথার চুল একটু বড় রেখে স্টাইল করে কেটেছি। ওই সময় উশৃংখল ছেলেরা এভাবে চুল কাটতো। 


আমাকে দেখেই মা চোখ বড় বড় করে তাঁকালেন। আদর তো দূরের কথা। অনেকক্ষণ তাঁকিয়ে থাকলেন। আমি বুঝেছি, মা কোনো কারণে রেগে আছেন। এমন সময় আমার এক বড় চাচাতো ভাই এলেন আমাদের উঠোনে । নাম আবুল খায়ের চৌধুরী। মা সঙ্গে সঙ্গে বললেন, আবুল খায়ের তারে ( আমাকে) ধর। আমি কিছু বুঝে উঠার আগেই চাচাতো ভাই খপ করে আমার হাতে ধরে ফেললেন। আর বললেন, জেঠি কি করতাম তারে? ওই সময় মহিলারা শাড়ি কাপড়ের আঁচলের শেষ মাথায় টাকা ছোট ভাজ করে আর পয়সা গিট্টু দিয়ে রাখতেন। মা ওই গিট্টু খুলে চার আনা পয়সা খায়ের ভাইকে দিয়ে বললেন, 

'তার চুলগুলো ছোট করে মেলিটিরির ( মিলিটারি) মতো কাটাই আনবি। আমি কি গুন্ডা পেটে লইছি?'

ওই সময় গুন্ডাপান্ডা টাইপ ছেলেরা এভাবে চুল কাটতো।


সেই থেকে আমি আর কোনো দিন চুল বড় রাখিনি। সব সময় আর্মি কাট। ছোট চুলে স্মার্ট আর ভদ্র লাগে। সালমান খান ছোট চুলে অভিনয় করে স্টার হন নি? 

এখন অনেক পোলাপানকে দেখি মাথার অর্ধেক চুল কাটে। এটা নাকি স্টাইল! আগে চোর ধরলে আমরা এভাবে মাথার অর্ধেক চুল কেটে দিতাম।


দেশে আসার পর আমার ইমিডিয়েট বড় আপা ফরিদা আমাকে বলেছিলেন, জানিস মন্টু, মা মারা যাওয়ার ঠিক পূর্ব মুহুর্তে দুইবার বলেছিলেন," মন্টুরে তুই কই"? এরপরই মা শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন।

লাভ ইউ মা। 

ছবিটা ১৯৯৪ সালে তুলেছিলাম। মিনোল্টা ক্যামেরায়।

© Karim Chowdhury 

26 May, 2023

Cumilla.

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অশ্লীল নাম

বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠান ও স্থানের বিচিত্র বা বিকৃত অর্থের নাম যা পরিবর্তন করা উচিতঃ ১. বোদা মহিলা মহাবিদ্যালয়, বোদা, পঞ্চগড় ২. চুমাচুমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাঙ্গামাটি ৩. সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খুলনা ৪. মানুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নীলফামারি ৫. সোনাকাটা ইউনিয়ন, তালতলী, বরগুনা ৬.বড়বাল ইউনিয়ন, মিঠাপুকুর, রংপুর ৭.সোনাখাড়া ইউনিয়ন, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ৮. ধনকামড়া গ্রাম, ভোদামারা, দিনাজপুর ৯.গোয়াকাটা, দোহার, ঢাকা ১০. গোয়াতলা, ময়মনসিংহ ১১.লেংটার হাট, মতলব, চাঁদপুর

বোতল

বোতল মানব জীবনে বোতল অপরিহার্য । বোতল অনেক অর্থেও ব্যবহার হয় । কোনো কোনো এলাকায় আনস্মার্ট, বেয়াক্কেল প্রকৃতির লোককেও বোতল বলা হয় । ইউরোপ আমেরিকায় থাকতে আমি ডৃংক করতাম । হার্ড ডৃংক কমই খেতাম । প্রতিদিনই বিয়ার খেতাম । বিয়ার স্বাস্থ্য ভালো রাখে ও কাজ করতে এনার্জি জোগায় । পরিমিত বিয়ার খেলে কেউ মাতাল হয় না । মাঝে মাঝে বিশেষ কোনো পার্টিতে হুইস্কি খাওয়া হতো । তাও দামি ব্র্যান্ডের । জনি ওয়াকার ব্ল্যাক লেবেল, টিচার্স, পাসপোর্ট, হেনেসি, শিভাস রিগাল, জ্যাক ড্যানিয়েলস । সাকুরায়ও অনেক সময় এসব ব্র্যান্ডের হুইস্কি পাওয়া যায় না । তো দেশে আসার পরও কিছু দিন ডৃংক করেছিলাম । কুমিল্লায় সরকার অনুমোদিত একটা মদের দোকান আছে চক বাজারে । নামঃ নাদের ট্রেডিং কোং । এটা প্রায় আজ ৫০ বছর । এখানে বিদেশি ব্র্যান্ডের ডৃংক পাওয়া যায় না । দেশিয় কোম্পানি ‘কেরো এন্ড কোং’ যা দর্শনায় অবস্থিত তার তৈরি ভদকা, হুইস্কি, জিন পাওয়া যায় । আমাদের সমাজতো রক্ষনশীল । তাই কান্দিরপাড় থেকে একটা স্প্রাইট কিনে অর্ধেক খেতে খেতে চক বাজার যেতাম । নাদেরে যখন পৌঁছতাম তখন স্প্রাইটের বোতল অর্ধেক খালি হয়ে যেতো । আমি বাবুল ভাইকে স্প্...

আমার দেখা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ

আমার দেখা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ সরকারঃ শেখ মুজিবের শাসনামল ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের মার্চে শুরু হয়ে সেই বছরেরই ডিসেম্বরের দিকে গিয়ে শেষ হয়। এই দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল। এই দুর্ভিক্ষকে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক হিসেবে গন্য করা হয়। ওই সময় আমি বুঝতাম। ক্লাশ ফোরে পড়তাম। আহারে ! কি যে অভাব ! অনেকের মতো আমরাও ভাত না খেয়ে রুটি খেয়েছি । তাও পরিমিত । কখনো জাউ খেয়েছি । শুকনো মরিচ পাওয়া যেতো না । কাঁচা মরিচের কেজি ছিলো ১৫০ টাকা । লবন ১২০ টাকা । আর সোনার ভরি ছিলো তখন ১৫০ টাকা । সোনা শুধু ওই সময় কম দাম ছিলো । চারদিকে অভাব । সারাদেশের মানুষের হাহাকার । কতো মানুষ না খেয়ে মারা গেছেন ! বিদেশি রিলিফ সব আওয়ামী লীগের লোকেরা চুরি করেছে । আর বেশিরভাগ রিলিফ সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে পাচার হয়েছিলো । তখন বর্ডার খোলা ছিলো তখন । মহিলাদের শাড়ি কাপড় ছিলো না । অনেকে মাছ ধরার জাল পরে লজ্জাস্থান ঢেকেছিলো । এসব ছবি পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছিলো । কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো অভাব ছিলো না । বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুই বছর তিন মাসের মাথায় ...