পাঞ্চালী চক্রবর্তী মিনি
২০০৭ সালে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতাম। আমার ছাত্র জীবনের বন্ধু পাঞ্চালি চক্রবর্তী একদিন ফোন করে বাসায় যেতে বললো। তার বাসা আর কে মিশন রোডে। পাঞ্চালি চক্রবর্তীর ডাক নাম মিনি। বাসা কুমিল্লা ঠাকুরপাড়া বাগানবাড়ি। আমার সাথে তার বন্ধুত্ব হয় ১৯৮৪ সালে। তার বাসায় আমার অবাধ যাতায়াত ছিল। সেও আমার মেজ আপার বাসায় আসতো প্রায় প্রতিদিন। আমার আপা, দুলাভাই, ভাগ্নীদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। আমার আব্বার সাথেও তার পরিচয় ছিল। ছোট আপা ফরিদার সঙ্গে খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল।
১৯৮৬ সালে আমি জাপান ছিলাম এক বছর। ওই সময় আমার মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। এই খবর শুনে মিনি ঠাকুরপাড়া থেকে সে আমাদের গ্রামের বাড়ি
ঘোড়ামারা চৌধুরী বাড়িতে এসে মাকে দেখে গিয়েছে। শহর থেকে আমাদের গ্রাম মাত্র এক কিলোমিটার পশ্চিমে। আমার সব আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে মিনির পরিচয় ছিল। মেয়েটি আমাকে প্রচন্ড ভালোবাসতো। এবং তা আমার আত্মীয়স্বজন সবাই জানতো।
মিনি সুন্দরী ছিলো। এবং বেশ লম্বা ছিলো। আমার চেয়েও এক ইঞ্চি লম্বা ছিলো। অত্যন্ত স্লিম ফিগার ছিলো মিনির।
পাঞ্চালি চক্রবর্তীর তথা মিনির বাবা-মা দুজনই স্কুল শিক্ষক ছিলেন। আমি মিনির বাগান বাড়ির বাসায় গেলে তার বাবা মা আমাকে প্রচন্ড স্নেহ করতেন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের যেসব কুসংস্কার থাকে মিনির পরিবারে সেসব কুসংস্কার ছিল না। আমি তাদের রান্না ঘরে বসে পাতিল থেকে হাত দিয়ে ভাত তরকারি নিয়ে খেতাম। একই বিছানায় শুয়ে আমি আর মিনি ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতাম। মিনির বাবা-মাও তখন বাসায় থাকতেন। মিনি বয়সে আমার এক বছরের বড় ছিল।
একদিন মিনি তার মাকে বললো, "মা, মন্টু যদি মুসলিম না হয়ে হিন্দু হতো তাহলে আমি মন্টুকেই বিয়ে করতাম।"।
এতই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
এরপর আমি ইউরোপ, আমেরিকায় চলে গেলে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আমেরিকা থেকে ফিরে আসি ২০০৪ সালে।
তো ২০০৭ সালে মিনি ফোন করে তার বাসায় যেতে বললে আমি তার আর কে মিশন রোডের বাসায় যাই।বাসায় তার দুই মেয়ে এবং হাজবেন্ডও ছিল।
বড় মেয়েটির নাম তুলতুল। তখন ধানমন্ডির ম্যাপল লিপ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে পড়তো। ছোট মেয়েটির নাম টুসি। টুসিও তখন স্কুলে পড়তো। মিনির হাজবেন্ডের নাম অমিতাভ লাহিড়ি। ওরাও সবাই জানতো মিনির সাথে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব আছে এবং মিনি আমাকে খুব ভালোবাসে।
বাসায় একসঙ্গে খাওয়া দাওয়া করার পর, মিনি বললো, তোর দাদার (মানে মিনির হাসবেন্ডের) ওপেন হার্ট সার্জারি হবে। তুইতো এক্সপোর্ট ইমপোর্ট বিজনেস বুঝিস। আমাদের ব্যবসা চীনের সঙ্গে। তোর দাদা মুন্নাকে চিনে। তুই যে জেনিস দাঁড় করিয়েছিস সেটাও জানে। তিনি চান দুই তিন মাস তুই আমাদের অফিসটা দেখাশোনা কর। সার্জারির পর তিনি সুস্থ হলে তোর ছুটি। আমাদের মূল ব্যবসা CHMC এর সাথে। CHMC মানে China Heavy Machineries Corporation.
তোর দাদা চেকে সিগনেচার করে দিয়ে যাবে। তোর যা প্রয়োজন উঠিয়ে নিস।
তাদের অফিসটা ছিল মতিঝিল মধুমিতা সিনেমা হলের উল্টো দিকে ইসমাইল ম্যানসনের দোতলায়। অফিসের নাম প্রিমিয়াম ইঞ্জিনিয়ার্স। আড়াই মাস আমি সেখানে ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করেছিলাম।
একটা জায়গায় আমার খটকা লেগেছিলো। উনার প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক একাউন্ট ছিল মতিঝিলে স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়াতে। বিষয়টা আমি মনে মনে মেনে নিতে পারিনি। স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ায় টাকা রাখলে সেই ব্যক্তি ইন্ডিয়া গিয়ে যেকোনো সময় সেই টাকাটা তুলে নিতে পারে।
তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে এলে আমি আমার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিই।
এরপর অনেক বছর যোগাযোগ নেই। ২০২০ সালে মিনি কানাডা থেকে ফোন করলো। আমার খোঁজখবর নিলো। তার দুই মেয়ের কথা বললো। বড় মেয়ে তুলতুল কানাডার ওয়াটারলু ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করে অটোয়াতে কানাডার সবচেয়ে বড় ক্যান্সার হসপিটালে গবেষক হিসাবে যোগ দিয়েছে। ছোট মেয়ে টুসি টরন্টো ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতিতে পড়ে।
মাঝে মাঝে মিনি দুই মেয়ের কাছে বেড়াতে যায়।
আমাকে জিজ্ঞেস করলো,তুই তো এখন কিছু করিস না। মেয়েদের বলেছি তোর জন্য কিছু টাকা পাঠিয়ে দিতে। আমি বললাম আরে না আমার কাছে টাকা আছে। মিনি আমাকে ধমক দিয়ে বললো চুপ। আগে যেমন আমার কথা শুনতি এখনো শুনতে হবে। আমার কাছ থেকে বিকাশ নাম্বার নিলো। ছোট মেয়ে টুসি আমার জন্য ৫০০ ডলার পাঠিয়েছিল।
আবার যোগাযোগ নেই।
আমি একটা ফোন নাম্বারই আজ ২২ বছর ব্যবহার করি।
তাই ফোনে আমাকে পেতে কোন সমস্যা নেই।
কয়েক মাস আগে মিনি ইন্ডিয়া থেকে আমার হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে আমাকে জানালো, তারা কলকাতার অভিজাত এলাকা সল্টলেক-এ বাড়ি করেছে। মিনি এবং তার হাজবেন্ড অমিতাভ লাহিড়ী সেখানেই থাকে। মেয়ে দুজন কানাডায়। আমাকে অনুরোধ করে মিনি বললো, তুই একবার এসে বেড়িয়ে যা। তোর এক টাকাও খরচ লাগবে না। বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় আসা যাওয়ার খরচও আমি তোকে দেবো। আমার বাসায় থাকবি, খাবি আর কলকাতা ঘুরাঘুরি করে এরপর আবার চলে যাবি।
আমার আর যাওয়া হয়নি।
আমি ভারত ছয়বার গিয়েছি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর আর কোনদিন ভারত যাব না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
মিনি আমার ফেসবুক বন্ধু লিস্টে আছে।
তাদের অফিসে কাজ করার সময় একটা ছবি খোঁজে পেলাম।
© Karim Chowdhury
10 J uly, 2026

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন