ঝামেলা
******
আমার জন্মই বোধহয় হয়েছে ঝামেলা লাগানোর জন্য।
জীবনে অনেক বিষয়ে অনেকের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে।
ছাত্রজীবনে কিছু সময় কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডে চাকরি করতে গিয়ে দেখি অনেকে ঘুষ খায়। তাদের সঙ্গে ঝামেলায় জড়িয়েছি।
এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান দাঁড় করাতে গিয়ে নীতি আদর্শ নিয়ে তার সাথে ঝামেলায় জড়িয়েছি।
ইউরোপ আমেরিকা থাকতে যেসব বন্ধুরা ব্যাংকিং চ্যানেলে টাকা না পাঠিয়ে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠাতো তাদের সাথে ঝামেলায় জড়িয়েছি।
প্রেম করতে গিয়ে প্রেমিকার সাথে ঝামেলায় জড়িয়েছি। ফলাফল ছ্যাকা খাওয়া।
কলকাতা দমদম (তখনকার নাম) এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন পুলিশের সাথে তীব্র বাদানুবাদ। হাতাহাতির বাকি ছিলো। ঝামেলায় জড়িয়েছিলাম সেখানেও।
হংকং এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন পুলিশের সাথে রীতিমতো গালাগালি। ঝামেলায় জড়িয়েছি সেখানেও।
জাপানে চাকরি করতে গিয়ে মালিকের সাথে ঝামেলা। স্টুডেন্ট ভিসায় গিয়েছিলাম। পার্ট টাইম কাজ করতাম এক হোটেলে। একদিন মালিক বললো, টয়লেট পরিস্কার করতে। আমি এই কাজ করতে অস্বীকার করলাম। সে জাপানি ভাষায় আমাকে ধমক দিয়ে বললো, 'গোনি ইত্তে ওয়া গোনি ইস্তা গায়ে'। আমি বললাম, 'ওয়াকারিমাসেন'। অর্থাৎ বুঝিনি। জাপানে প্রায় সব হোটেলেই একটা জাপানি টু ইংলিশ ডিকশনারী থাকে। মালিক ডিকশনারি এনে আমাকে জাপানি লেখাটা দেখালো। জাপানি ভাষার ডানদিকে ইংরেজিতে লেখা Do in Japan as the Japanese do.
আমি তাকে বললাম, তোর এখানে চাকরিই করবো না। সাথে সাথে চাকরি ছেড়ে দিয়েছি। মিন মিন করে বাংলায় বললাম, তোর মতো বহু হোটেল মালিককে দেশে ধমকাইছি। সেখানেও ঝামেলা।
পরশু দিনই লিখেছি ভিয়েনার এক বারে (Bar) মারামারি করেছিলাম। সেখানেও ঝামেলা।
ইউরোপ আমেরিকা আরো অনেক ঝামেলা ছিল।
দেশে এসে সিএনজি অটোরিকশা, ব্যাটারি চালিত ইজি বাইকের সাথে প্রতিদিনই ঝামেলা হয়।
১০ বছর আগে গভর্নর বডির সভাপতির অনুরোধে একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় তিন বছর ইংরেজি পড়িয়েছিলাম। সহকর্মী শিক্ষকদের সাথে অনেক ঝামেলা হয়েছিলো। ক্লাস শুরুর ঘন্টা বাজলে আমি ক্লাসে চলে যাই। অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ ঘন্টা বাজার পরও ১০ মিনিট শিক্ষক রুমে বসে গল্প করেন। ১০ মিনিট পর ক্লাস রুমে যান। কোনো শিক্ষক ছুটি নিলে আমাকে তার প্রক্সি ক্লাস নিতে বলেন। আমি ছিলাম পার্ট টাইম বা খণ্ডকালীন শিক্ষক। অনেক শিক্ষকের কাছে ছাত্রছাত্রীরা প্রাইভেট না পড়লে সেইসব শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষায় কম নাম্বার দেন। কাউকে ফেইলও করিয়ে দেন। এই নিয়ে এদের সাথে শুধু ঝামেলা নয়। রীতিমতো ঝগড়াঝাটি করেছি। পরে জিদ্দে কোনো নোটিশ দেয়া ছাড়াই চাকরি ছেড়ে দিই।
বিয়ে করেছিলাম একটা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই আমি চা খাই এবং সিগারেট খাই। এই সকাল থেকেই শুরু হয় তার সাথে ঝামেলা। সিগারেট খাওয়া নিয়ে। আমি সরাসরি বলেছি। তোমাকে বিয়ে করেছি সেদিন। আর সিগারেট খাই আমি ৩০ বছর ধরে। তোমার চেয়ে সিগারেট আমার বেশি প্রিয়। আমি তোমাকে ছাড়তে পারবো কিন্তু সিগারেট খাওয়া ছাড়তে পারবো না।
আরও অনেক বিষয়ে তার সাথে ঝামেলা। আমি পত্রপত্রিকায় লিখতে পছন্দ করি। আমার এই লেখালেখি তার পছন্দ না। তখন আমি ঢাকায় থাকি। বাসা মিরপুর। সঙ্গত কারণে কিছু সাংবাদিকের সঙ্গে আমাকে সময় কাটাতে হতো। শফিক রেহমান, সজীব ওনাসিস সহ আরো অনেকের সঙ্গেই আমার সময় কাটতো। আমার সাবেক স্ত্রী এগুলো মোটেও পছন্দ করতো না।এমনকি তাদের সাথে চলতে আমাকে বারণ করতো। অনেক কষ্টে দাম্পত্য জীবন ছিল চার বছর। তারপর ছাড়াছাড়ি।
ছাত্র জীবন থেকে বিএনপি সমর্থন করে আসছি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আমার ঝামেলা।
এখন নতুন ঝামেলা দেখা দিয়েছে জামাতে নামাজ পড়া নিয়ে। বিরাট এক ঝামেলা। কারো শরীরের সঙ্গে আমার শরীর লাগলে আমার ভালো লাগে না। বিষয়টি আমার খুবই অপছন্দ। সবাই গা ঘেষে দাঁড়ায়। ছয় ইঞ্চি দূরে দাঁড়ালে কি নামাজ হবে না? সবার সামাজিক পারিবারিক অবস্থা এক নয়। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাও এক নয়। সেজদায় গেলে একজনের কনুই আরেকজনের কনুইর সাথে লাগে। কেউ কেউ 'সুবহানা রাব্বিয়াল আলা' ফিসফিস করে জোরে পড়ে যা পাশের জন স্পষ্ট শুনতে পায়। এতে আমার মনোযোগ নষ্ট হয়।
অনেকের মুখ থেকে দুর্গন্ধ পাওয়া যায়।
আত্তাহিয়াতু পড়ার বৈঠকে একজনের রানের সাথে আরেকজনের রান লেগে থাকে। আমি তা মোটেও পছন্দ করি না।
এভাবে গায়ে গা ঘেষে দাঁড়ানো তো আনহাইজিনিকও। অনেকেরই বিভিন্ন রকমের স্কিন ডিজিজ থাকে। গতকাল মাগরিব নামাজের সময় একজনকে বললাম, একটু দূরে দাঁড়াতে। তিনি জ্ঞান দিয়ে বললেন, গ্যাপ থাকলে এই গ্যাপে শয়তান ঢুকবে।
আমি ঘাড় ত্যারা করে বললাম,করোনার সময় যে ৩ ফিট দূরে দূরে দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তাম তখন কি শয়তান মারা গেছিলো? নামাজ পড়তে গেলেও আমার ঝামেলা।
একটি বিশেষ ইসলামিক গ্রুপের সদস্যরা নামাজে এমনভাবে দাঁড়ায় তাদের দুই পায়ের দূরত্ব থাকে দুই ফিট কমপক্ষে। এই জায়গায় দুইজন দাঁড়ানো যাবে। এই দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে একজন মানুষ অনায়াসে যাওয়া আসা যাওয়া করতে পারবে। দেখতেও তো অসুন্দর লাগে। আল্লাহর দরবারে দাঁড়িয়ে পা দুটো এমন ফাঁক করলে কি খুব সুন্দর দেখায়?এটাও আমার কাছে ঝামেলা মনে হয়।
Karim Chowdhury
13 September 2026
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন