সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নাম যন্ত্রণা

নাম যন্ত্রণা
------------
যারা বিদেশে থাকেন তাদের অনেকেই নিজের নাম নিয়ে যন্ত্রণায় ভোগেন । মধ্যপ্রাচ্যের কথা বলতে পারবো না । ইউরোপ-আমেরিকায় যারা থাকেন বা ছিলেন তারা এ বিষয়ে ভালো জানেন । অবশ্য আমাদের দেশের মানুষের নামও খুব বিচিত্র । ছেলেদের নামের মধ্যে কালা মিয়া, লাল মিয়া, সোনা মিয়া,সুন্দর আলী এসব কমন নাম । মেয়েদের নামের মধ্যে পরিষ্কার খাতুন, কলমজান বেগম, কইতরি আক্তার এসব নাম গ্রামে এখনো বেশ জনপ্রিয় । পৃথিবীতে আমরাই একমাত্র জাতি, যে জাতি নামকে বিকৃত করে বলে । কালামকে কালাইম্মা, কামালকে কামাইল্লা, জামালকে জামাইল্লা, করিমকে করিম্মা, শফিককে শফিক্কা, বাবুকে বাউব্বা । মিতুকে মিত্তা, রোজিকে রইজ্জা,জলিকে জইল্লা, লিপিকে লিপ্পা, শানুকে শাউন্না, নাজমাকে নাউজ্জা এসব খুব শোনা যায় ।
আমি প্রথম নাম নিয়ে যন্ত্রণায় পরেছিলাম জাপানে । ওরা আমাদের নাম ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারে না । আগে থেকে যারা জাপানে ছিলেন তারা বুদ্ধি দিলেন- নাম বদলে একটা ইংরেজি নাম রাখতে । তখন সবেমাত্র নাকে টিপ দিয়ে বিয়ার খাওয়া শিখেছি । বিয়ারের গন্ধ প্রথম প্রথম খারাপ লাগতো । আমাদের সিনিয়ার ভাই বাকের, খুব ফানি ক্যারেক্টার । বাসা ঝাউতলা । তিনি বুদ্ধি দিলেন নাকে টিপ দিয়ে ধরে বিয়ার গিলে ফেলতে । অল্প কিছুক্ষন নাক বন্ধ রেখে হা করে মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে তারপর নাক ছেড়ে দিতে । তাহলে গন্ধ লাগবে না । আমি মেজাজ খারাপ করে বললাম, এতো কষ্ট করে বালটা খাওয়ার দরকার কী ? শেষমেশ আমি নিজেই বিয়ার খাওয়ার প্রতিযোগিতায় ফার্স্ট হতাম । কচু গাছ কাটতে কাটতে অনেক মানুষ যেমন ডাকাত হয়ে যায় অনেকটা সেরকম আর কি !
তো নাকে ধরে বিয়ার খেতে খেতে ডাউন টাউন
টোকিওর আকাবেনি এলাকার এক বাসায় সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, আমরা সবাই কর্মক্ষেত্রে নাম বদলে ফেলবো । ইংরেজি নাম নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হলো, মুন্না (দেশের এখন নামকরা ব্যবসায়ী । জেনিস(Jennys) শু এর মালিক ) হয়ে গেলো রবিন Robin। কাওসার হলো জন John ( এখন তাবলীগ জামাতের জেলার বড় নেতা) । আর আমি হলাম জনি Johny। এখন ফেসবুক লেখক। নতুন বিয়ার খেয়ে আমি কাঁদো কাঁদো গলায় বললাম, বিদেশে এসে বাপ মার দেয়া নামও বদলে ফেলতে হবে ?
এতে সমস্যা আরো বাড়লো । আমাকে কেউ জনি বলে ডাকলে আমি সাড়া দিই না । আমি টেরই পাইনা যে আমাকে কেউ ডাকছে । পনেরো দিন পর আমি হলাম কারিম । এ নিয়ে জাপানিদের সঙ্গে আমি কম বেশি ঝগড়াও করেছি ।
ইউরোপে গিয়ে আরো বিপদে পরেছিলাম । আমার ফ্যামিলি নেম Chowdhury. পাসপোর্ট, সার্টিফিকেটেও তাই। ওরা আমাকে কউধুরি বলে ডাকা শুরু করলো । CH এর উচ্চারণ জার্মান ভাষায় অনেক ক্ষেত্রে ‘ক’ হয় । ইউরোপ -আমেরিকায় কাগজ পত্রে থাকা নামের শেষাংশ ডাকে। যা ফ্যামিলি নেম।
খুবই মন খারাপ হয়ে গেলো । নিজের নামের বিকৃত উচ্চারণে মনে বিরাট কষ্ট পেলাম। একদিন রেগে মেগে ম্যানেজার সিলভিয়াকে বললাম, তুমি আমাকে কউধুরি বলছো কেনো ? সিলভিয়া বললো, তোমাকে ডাকলাম একটা কাজের জন্য আর তুমি শুরু করলে নাম নিয়ে যন্ত্রণা ! আমি তর্ক করে বললাম, আমি যদি তোমাদের নাম ঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারি তোমরা কেনো পারো না আমাদের নাম ? আমরা গরিব দেশের নাগরিক বলে তোমরা ইচ্ছা করে আমাদের অপমান করো । শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত হলো, আমি নাম বদলাবো । নিজেই ম্যাকডোনাল্ডস অফিসে বললাম, আমার একটা নিক নেম আছে, মন্টু- তোমরা দয়া করে আমাকে এই নামে ডেকো । আশা করি পারবে । কাগজে লিখে দিলাম Montu.
খাল কেটে কুমির আনলাম আর কি ! এখন ৬৬ জন কলিগসহ অফিসের ৬ কর্মকর্তা আমাকে ডাকতে লাগলো,মন্ডো (Mondo) । মন্ডো নামে অস্টৃয়ায় বড় একটা ডিপার্টমেন্ট স্টোর আছে । ফ্র্যান্সাইজ কম্পানি । সারা দেশে এর কয়েকশ শাখা আছে । নামের এই করুণ পরিণতি দেখে মনে খুবই কষ্ট পেলাম । শেষমেশ তাদেরকে অনুরোধ করলাম, আমাকে করিম নামে ডাকতে ।
আমার কলিগদের মধ্যে রোমানিয়া, হাঙ্গেরি, চেক রিপাবলিক, অ্যালবেনিয়া, তুরস্ক,ইরান, সিরিয়া, ইজিপ্ট, ইন্ডিয়া, পাকিস্তান, সার্বিয়া, ক্রোয়েশিয়া, বসনিয়া,জার্মানী আর অস্টৃয়ার নাগরিক ছিলো । প্রত্যেকেই তাদের নিজের ভাষায় আমার নাম উচ্চারণ করতে লাগলো । কেউ বলতো কারিম, কেউ ক্যারিম, কেউ কুরিম । তুরস্কের এক ছাগল, নাম এরসিয়াস শুক্রু, একদিন আমাকে ডাকলো, গারিব । আমি তাকে বললাম, তুমি আমার নামে জি পাইলা কই ? সে জার্মান ভাষায় বললো, গেট শন, গেট শন-মানে চলবে চলবে।
আমেরিকায় গিয়ে স্থায়ীভাবে হয়ে গেলাম ক্যারিম । ওরা কখনোই করিম উচ্চারণ করতে পারে না।
সাদ্দাম হোসেনকে ওরা বলে সাদাম হোছেইন।
© করিম চৌধুরী
September 21, 2015
Cumilla

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অশ্লীল নাম

বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠান ও স্থানের বিচিত্র বা বিকৃত অর্থের নাম যা পরিবর্তন করা উচিতঃ ১. বোদা মহিলা মহাবিদ্যালয়, বোদা, পঞ্চগড় ২. চুমাচুমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাঙ্গামাটি ৩. সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খুলনা ৪. মানুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নীলফামারি ৫. সোনাকাটা ইউনিয়ন, তালতলী, বরগুনা ৬.বড়বাল ইউনিয়ন, মিঠাপুকুর, রংপুর ৭.সোনাখাড়া ইউনিয়ন, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ৮. ধনকামড়া গ্রাম, ভোদামারা, দিনাজপুর ৯.গোয়াকাটা, দোহার, ঢাকা ১০. গোয়াতলা, ময়মনসিংহ ১১.লেংটার হাট, মতলব, চাঁদপুর

বোতল

বোতল মানব জীবনে বোতল অপরিহার্য । বোতল অনেক অর্থেও ব্যবহার হয় । কোনো কোনো এলাকায় আনস্মার্ট, বেয়াক্কেল প্রকৃতির লোককেও বোতল বলা হয় । ইউরোপ আমেরিকায় থাকতে আমি ডৃংক করতাম । হার্ড ডৃংক কমই খেতাম । প্রতিদিনই বিয়ার খেতাম । বিয়ার স্বাস্থ্য ভালো রাখে ও কাজ করতে এনার্জি জোগায় । পরিমিত বিয়ার খেলে কেউ মাতাল হয় না । মাঝে মাঝে বিশেষ কোনো পার্টিতে হুইস্কি খাওয়া হতো । তাও দামি ব্র্যান্ডের । জনি ওয়াকার ব্ল্যাক লেবেল, টিচার্স, পাসপোর্ট, হেনেসি, শিভাস রিগাল, জ্যাক ড্যানিয়েলস । সাকুরায়ও অনেক সময় এসব ব্র্যান্ডের হুইস্কি পাওয়া যায় না । তো দেশে আসার পরও কিছু দিন ডৃংক করেছিলাম । কুমিল্লায় সরকার অনুমোদিত একটা মদের দোকান আছে চক বাজারে । নামঃ নাদের ট্রেডিং কোং । এটা প্রায় আজ ৫০ বছর । এখানে বিদেশি ব্র্যান্ডের ডৃংক পাওয়া যায় না । দেশিয় কোম্পানি ‘কেরো এন্ড কোং’ যা দর্শনায় অবস্থিত তার তৈরি ভদকা, হুইস্কি, জিন পাওয়া যায় । আমাদের সমাজতো রক্ষনশীল । তাই কান্দিরপাড় থেকে একটা স্প্রাইট কিনে অর্ধেক খেতে খেতে চক বাজার যেতাম । নাদেরে যখন পৌঁছতাম তখন স্প্রাইটের বোতল অর্ধেক খালি হয়ে যেতো । আমি বাবুল ভাইকে স্প্...

আমার দেখা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ

আমার দেখা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ সরকারঃ শেখ মুজিবের শাসনামল ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের মার্চে শুরু হয়ে সেই বছরেরই ডিসেম্বরের দিকে গিয়ে শেষ হয়। এই দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল। এই দুর্ভিক্ষকে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক হিসেবে গন্য করা হয়। ওই সময় আমি বুঝতাম। ক্লাশ ফোরে পড়তাম। আহারে ! কি যে অভাব ! অনেকের মতো আমরাও ভাত না খেয়ে রুটি খেয়েছি । তাও পরিমিত । কখনো জাউ খেয়েছি । শুকনো মরিচ পাওয়া যেতো না । কাঁচা মরিচের কেজি ছিলো ১৫০ টাকা । লবন ১২০ টাকা । আর সোনার ভরি ছিলো তখন ১৫০ টাকা । সোনা শুধু ওই সময় কম দাম ছিলো । চারদিকে অভাব । সারাদেশের মানুষের হাহাকার । কতো মানুষ না খেয়ে মারা গেছেন ! বিদেশি রিলিফ সব আওয়ামী লীগের লোকেরা চুরি করেছে । আর বেশিরভাগ রিলিফ সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে পাচার হয়েছিলো । তখন বর্ডার খোলা ছিলো তখন । মহিলাদের শাড়ি কাপড় ছিলো না । অনেকে মাছ ধরার জাল পরে লজ্জাস্থান ঢেকেছিলো । এসব ছবি পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছিলো । কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো অভাব ছিলো না । বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুই বছর তিন মাসের মাথায় ...