সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

দাড়িঃ একটি বিতর্কিত পোস্ট

 দাড়িঃ একটি বিতর্কিত পোস্ট 

**********************

৬ বছর আগে আমি বেশ লম্বা দাড়ি রেখেছিলাম। আমার গাল ভর্তি দাড়ি। মাথা ভর্তি চুল। বুক ভর্তি পশম। পাজামা পাঞ্জাবি আর টুপি পরলে আমাকে রীতিমতো ছোটখাটো মাওলানা মনে হতো। আমার দাড়ি এবং চুল বেশ মোটা এবং ঘন। একজন আমার লম্বা দাড়িতে ধরে বলেছিল, আরে আপনার দাড়ি তো হেজারকাটা।

দাড়ি বড় রাখার পর দেখলাম চুলকায়। চুল বড় রাখলে যেমন সেবা-যত্ন করতে হয়। শ্যাম্পু দেয়া, কন্ডিশনার দেয়া। দাড়ি বড় রাখলেও যত্ন করতে হয়। আমি ৪৫ বছর ক্লিন সেভ করেছি। তাই আমার দাড়ি লম্বা নয়। কোঁকড়ানো। কোঁকড়ানো দাড়ি আমার ভালো লাগে না। সেলুনে গিয়ে ১ হাজার টাকা দিয়ে দুই ঘন্টা সময় নষ্ট করে এক ধরনের ক্যামিক্যাল ( যা সেলুনে পাওয়া যায়) দিয়ে কোঁকড়ানো দাড়িগুলোকে সোজা লম্বা করেছি। সেলুন থেকে আমাকে বললো, আঙ্কেল এই মেডিসিন দিয়ে দাঁড়ি সোজা কইরেন না। স্কিনের বিরাট ক্ষতি হয়। 

পকেটে ব্রাশ, চিরুনি দুটোই রাখতাম। দিনের মধ্যে ১০০ বার আচরাই। শ্যাম্পু, কন্ডিশনার দিই। একজন বললো দাড়িতে সরিষার তেল দিতে। দিলাম।  আরেকজন বললো দাড়িতে মেহেদি দিতে। আমি একটা ধমক দিয়ে বললাম, ধুর মিয়া। এমনি অনেক ঝামেলায় আছি বড় দাড়ি নিয়ে। আপনি মেহেদি দেওয়ার কথা বলে আরেক নতুন ঝামেলার সৃষ্টি করতে চাচ্ছেন। অজু করলে দাড়ির পানিতে শার্ট বা পাঞ্জাবি ভিজে যায়। একসময় বিরক্ত হয়ে দাঁড়ি ছোট করে ফেলি। 

এবার বিভিন্ন জন বিভিন্ন ফতোয়া দেয়া শুরু করলো। একটা দাড়িতে ৭০ টা ফেরেশতা থাকে। দাড়ি নবীর সুন্নত। দাড়ি রেখে কেটে ফেলা পাপ। আরো অনেক কিছু শুনতে হয়েছে।

অগোছালো,এলোমেলো দাড়ি যাদের তাদের আমার মোটেও ভালো লাগে না। উস্কোখুস্কো দাড়ি একটু সুন্দর করে রাখো।

যারা ফতোয়া দিয়েছে তাদেরকে আমি কিছু উত্তর দিয়েছি। 

১৪০০ বছর আগে সেভ করার আধুনিক যন্ত্রপাতি তো দূরের কথা ব্লেডও ছিল না। কাজেই অনেকেই দাড়ি রাখতেন। এরিস্টটল প্লেটোরও দাড়ি ছিল তাদের পোট্রেট এ দেখা যায়। 

জৈন ধর্ম ইসলাম ধর্মের চেয়ে প্রাচীন ধর্ম। শিখরা যে ধর্ম পালন করে। শিখরা দাড়িতে কোনদিন ব্লেড লাগায় না। তাহলে কি আমরা শিখদের প্রথা ধার করেছি? যেহেতু শিখদের ধর্ম ইসলাম ধর্মের চেয়েও প্রাচীন।

বিধর্মী এবং নাস্তিকদের মধ্যে অনেকেই দাড়ি রেখেছেন। 

কাল মার্কস, ফ্রেডারিখ এঙ্গেলস, লেনিন, হো চি মিন, ফিদেল কাস্ত্রো, চে গুয়েভারা, লিও তলস্তয়, ফিউদর দস্তয়েভস্কি, আব্রাহাম লিংকন, রবীন্দ্রনাথ, হালের নরেন্দ্র মোদি। অনেক হিন্দু পুরোহিতও দাড়ি রাখেন।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এক উপন্যাসে পড়েছিলাম, তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু আমেরিকান কবি এলেন গিনসবার্গ দাড়ি রেখেছিলেন। নিউইয়র্কের বাসায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় গিনসবার্গ কে প্রশ্ন করেছিলেন কেন তিনি দাড়ি রাখলেন। এলেন গিনসবার্গ উত্তর দিয়েছিলেন, ডেইলি ডেইলি সেভ করা একটা ঝামেলা। দাড়ি রেখে দিলাম। অপ্রয়োজনী একটা ঝামেলা থেকে মুক্তি পেলাম।  

রবীন্দ্রনাথ আর কাজী নজরুল ইসলামের ছবি নিয়ে অনেক আগে একটা গল্প শুনেছিলাম। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এক বাসায় প্রবেশ করে। সেই বাসার ড্রয়িং রুমে রবীন্দ্রনাথ এবং কাজী নজরুল ইসলামের ছবি ছিল। দাড়ি দেখে রবীন্দ্রনাথের ছবিকে পাকিস্তান সেনাবাহিনী শ্রদ্ধা করেছিল। আর কাজী নজরুল ইসলামের ছবিকে নামিয়ে পা দিয়ে পিসে টুকরো টুকরো করে ফেলেছিল।

আমি আরো বললাম, কাবা শরীফের গ্র্যান্ড মুফতির লম্বা দাড়ি ছাড়া সৌদি আরবে আর কার লম্বা দাড়ি আছে? গ্র্যান্ড মুফতিকে নিয়োগ দেন স্বয়ং সৌদি বাদশা। যার লম্বা দাড়ি নেই। হিন্দি সিনেমার ভিলেইনের মতো ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। অথচ তিনি মক্কা মদিনার রক্ষক! তাহলে কি তিনি নবীর সুন্নত মানেন না? 

সিরিয়ার শক্তিশালী প্রেসিডেন্ট প্রয়াত হাফেজ আল আসাদ সব সময় ক্লিন সেভ করতেন। তার ছেলে বাসার আল আসাদও ক্লিন সেভড। মিশরের প্রেসিডেন্ট জামাল নাসের, আনোয়ার সাদত, হুসনি মোবারক ক্লিন সেভ করতেন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি ক্লিন সেভ করেন। জর্ডানের বাদশা হোসেন ক্লিন সেভ করতেন। তার ছেলে বর্তমান বাদশা আব্দুল্লাহ ক্লিন শেভ করেন। সাদ্দাম হোসেন ক্লিন সেভ করতেন। লিবিয়ার গাদ্দাফিও ক্লিন সেভ করতেন।  বর্তমান কাতারের আমীর শেখ তামিম বিন হামাদ আলে সানি ক্লিন সেভ করেন। মাহাথির মোহাম্মদ এই বয়সেও ক্লিন সেভ করেন। টার্কিশ প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ক্লিন সেভ করেন। 

আরব দেশের কোনো রাজা-বাদশারাই লম্বা দাড়ি রাখেন না। অথচ তাদের নির্দেশেই ইসলামিক স্কলাররা ফতোয়া দেন এক মুষ্টি দাড়ি রাখা সুন্নত!!!  

ইহুদি ধর্মের অনেকেই দাড়ি রাখেন। ১৩ বছর আগে আমি একবার তাবলীগে গিয়েছিলাম। চার মাস অর্থাৎ ১২০ দিন তাবলীগ জামাতে ছিলাম। অর্থাৎ আমি তাবলীগ জামাতের তিন চিল্লার সাথী। প্রত্যেক তাবলীগ জামাতের গ্রুপেই একজন আমীর থাকেন। একদিন আলোচনায় আমীর সাহেব বললেন, আপনি যে মুসলমান তার প্রমাণ কি? প্রমাণ হইলো দাড়ি। আমীর সাহেবের নাম সাইদ হুজুর। তিনি একজন আলেম। রেসকোর্স ফাতেমা তুজ জোহরা মহিলা মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল তিনি। 

(আমি রেইস কোর্স প্রায়ই যাই। রেসকোর্স আমার ছাত্র জীবনের অনেক বন্ধু আছে। তাছাড়া আমাদের সবার বড় আপা পাকিস্তান আমল থেকে রেইস কোর্সের স্থায়ী বাসিন্দা। চেনার মতো ফ্যামিলি। চার ভাগিনা দুই ভাগ্নে সকলেই মাস্টার্স পাস। সাবেক জাতীয় দলের ক্রিকেটার ফয়সাল হোসেন ডিকেন্স আমার নাতি। অর্থাৎ আমার বড় ভাগিনার ছেলে। সাঈদ হুজুরের সঙ্গে মাঝেমধ্যে দেখা হলে আমাকে সালাম দিয়ে মুচকি হাসেন। তিনি আমার জুনিয়র।) 

আমি আলোচনায় আপত্তি জানালাম। এই ঘটনা বাগেরহাটের এক মসজিদে। আমি দাড়ি নিয়ে হুজুরকে কিছু উদাহরণ দিলাম। আমীর সাহেব অসন্তুষ্ট হয়ে বললেন, করিম সাহেব ভেজাল লাগাইন্না কথা কন। মুসলমানদের মধ্যে অনেকেরই দাড়ি নেই। কিন্তু জৈন ধর্মে প্রতিটি সদস্যের লম্বা দাড়ি আছে। 

ভাবছি ছয় বছর আগে লম্বা দাড়ি ছিল বলে, প্রতিটি দাড়িতে ৭০টা ফেরেশতা ছিলেন। দাড়ি কেটে ফেলার পর এই হাজার হাজার লাখ লাখ ফেরেশতা চলে গেলেন!!! তারা কোথায় আছেন? আমি কি তাদের আবাসস্থল নষ্ট করলাম?

Karim Chowdhury

#fb #follower #followerseveryone #islam

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অশ্লীল নাম

বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠান ও স্থানের বিচিত্র বা বিকৃত অর্থের নাম যা পরিবর্তন করা উচিতঃ ১. বোদা মহিলা মহাবিদ্যালয়, বোদা, পঞ্চগড় ২. চুমাচুমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাঙ্গামাটি ৩. সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খুলনা ৪. মানুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নীলফামারি ৫. সোনাকাটা ইউনিয়ন, তালতলী, বরগুনা ৬.বড়বাল ইউনিয়ন, মিঠাপুকুর, রংপুর ৭.সোনাখাড়া ইউনিয়ন, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ৮. ধনকামড়া গ্রাম, ভোদামারা, দিনাজপুর ৯.গোয়াকাটা, দোহার, ঢাকা ১০. গোয়াতলা, ময়মনসিংহ ১১.লেংটার হাট, মতলব, চাঁদপুর

আমার দেখা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ

আমার দেখা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ সরকারঃ শেখ মুজিবের শাসনামল ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের মার্চে শুরু হয়ে সেই বছরেরই ডিসেম্বরের দিকে গিয়ে শেষ হয়। এই দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল। এই দুর্ভিক্ষকে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক হিসেবে গন্য করা হয়। ওই সময় আমি বুঝতাম। ক্লাশ ফোরে পড়তাম। আহারে ! কি যে অভাব ! অনেকের মতো আমরাও ভাত না খেয়ে রুটি খেয়েছি । তাও পরিমিত । কখনো জাউ খেয়েছি । শুকনো মরিচ পাওয়া যেতো না । কাঁচা মরিচের কেজি ছিলো ১৫০ টাকা । লবন ১২০ টাকা । আর সোনার ভরি ছিলো তখন ১৫০ টাকা । সোনা শুধু ওই সময় কম দাম ছিলো । চারদিকে অভাব । সারাদেশের মানুষের হাহাকার । কতো মানুষ না খেয়ে মারা গেছেন ! বিদেশি রিলিফ সব আওয়ামী লীগের লোকেরা চুরি করেছে । আর বেশিরভাগ রিলিফ সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে পাচার হয়েছিলো । তখন বর্ডার খোলা ছিলো তখন । মহিলাদের শাড়ি কাপড় ছিলো না । অনেকে মাছ ধরার জাল পরে লজ্জাস্থান ঢেকেছিলো । এসব ছবি পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছিলো । কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো অভাব ছিলো না । বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুই বছর তিন মাসের মাথায় ...

বোতল

বোতল মানব জীবনে বোতল অপরিহার্য । বোতল অনেক অর্থেও ব্যবহার হয় । কোনো কোনো এলাকায় আনস্মার্ট, বেয়াক্কেল প্রকৃতির লোককেও বোতল বলা হয় । ইউরোপ আমেরিকায় থাকতে আমি ডৃংক করতাম । হার্ড ডৃংক কমই খেতাম । প্রতিদিনই বিয়ার খেতাম । বিয়ার স্বাস্থ্য ভালো রাখে ও কাজ করতে এনার্জি জোগায় । পরিমিত বিয়ার খেলে কেউ মাতাল হয় না । মাঝে মাঝে বিশেষ কোনো পার্টিতে হুইস্কি খাওয়া হতো । তাও দামি ব্র্যান্ডের । জনি ওয়াকার ব্ল্যাক লেবেল, টিচার্স, পাসপোর্ট, হেনেসি, শিভাস রিগাল, জ্যাক ড্যানিয়েলস । সাকুরায়ও অনেক সময় এসব ব্র্যান্ডের হুইস্কি পাওয়া যায় না । তো দেশে আসার পরও কিছু দিন ডৃংক করেছিলাম । কুমিল্লায় সরকার অনুমোদিত একটা মদের দোকান আছে চক বাজারে । নামঃ নাদের ট্রেডিং কোং । এটা প্রায় আজ ৫০ বছর । এখানে বিদেশি ব্র্যান্ডের ডৃংক পাওয়া যায় না । দেশিয় কোম্পানি ‘কেরো এন্ড কোং’ যা দর্শনায় অবস্থিত তার তৈরি ভদকা, হুইস্কি, জিন পাওয়া যায় । আমাদের সমাজতো রক্ষনশীল । তাই কান্দিরপাড় থেকে একটা স্প্রাইট কিনে অর্ধেক খেতে খেতে চক বাজার যেতাম । নাদেরে যখন পৌঁছতাম তখন স্প্রাইটের বোতল অর্ধেক খালি হয়ে যেতো । আমি বাবুল ভাইকে স্প্...