সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইমাম

 ইমাম

****

আমরা যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম তখন আমাদের গ্রামের মসজিদে কোনো বেতনভুক্ত ইমাম ছিলো না।  মসজিদে ইমামতি কর‍তেন সহজ-সরল মুরব্বিরা। বেশিরভাগ সময় নামাজ পড়াতেন শ্রদ্ধেয় আফতাব উদ্দিন মাস্টার। উনি আমাদের গ্রামের। বেশিরভাগ সময় তিনি সুরা হাসর, সুরা কদর পড়তেন। উনার পেছনে নামাজ পড়তে পড়তে প্রাইমারি স্কুল জীবনেই এই দুটো সুরা আমার মুখস্থ হয়ে গিয়েছিলো। অনেক দিন মাগরিব এবং এশার নামাজের সময় আমি আজান দিতাম। তখন ফোর ফাইভে পড়তাম। 

এরপর দীর্ঘ সময় আমাদের মসজিদে ইমামতি করেছেন জনাব আবদুল হামিদ খন্দকার। তিনিও আমাদের গ্রামের। তিনিও আমাদের প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক ছিলেন। সেই কালেই তিনি গ্র‍্যাজুয়েট ছিলেন। তাকেও কোনো বেতন দেয়া হতো না। শুক্রবার জুমার নামাজে মুসুল্লিরা চার আনা, আট আনা দিলে সেগুলো নিতেন। অনেকের আত্মীয় মারা গেলে বা কেউ অসুস্থ হলে নামাজের পর ইমাম সাহেবের হাতে এক টাকা বা দুই টাকা দিয়ে মিলাদ পড়াতে বলতেন। 

একদিন স্কুলে দুষ্টুমি করায় এই হামিদ স্যার আমাকে মেরেছিলেন। তিনি ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুল ছাড়া বাকি চার আঙুলে মোট করে ধরে জালি বেত দিয়ে হাতের তালুতে পেটাতেন। উনি এক জায়গায় পেটাতেন। শরীরের অন্য কোন অংশে পেটাতেন না। এক জায়গায় মারলে আঘাত বেশি পাওয়া যায়। বড় হয়েও কেউ বেশি ফাইজলামি করলে আমরা বলতাম, তারে এক জায়গায় পিটানো দরকার।

কোনো সময় তিনি না থাকলে অন্য মুরুব্বিরা নামাজ পড়াতেন। এতো ঘোরপ্যাঁচ তারা জানতেন না, ভেতরে এতো কুটিলতা ছিলো না। নামাজ পড়িয়ে বেতন নিতেন না। কাজ করে খেতেন।  

আমরা যখন হাই স্কুলে পড়ি তখন বরুড়ার একজন হুজুরকে ইমাম হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। দূরের গ্রাম বলে খুব সামান্য বেতন দেওয়া হতো। মানুষ ভালোবেসে দাওয়াত-টাওয়াত দিতো। একেক দিন একেকজনের ঘরে হুজুর খাবার খেতেন। কেউ কখনো ভালো মাছ-মাংসের তরকারি রান্না করলে এক বাটি ইমামের জন্য পাঠাতেন। 

কিন্তু মাদ্রাসা ব্যবসা দেশটাকে কী থেকে কী করে ফেললো। এখন গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষও হুজুর টাইপ লোক দেখলে সন্দেহ করে।

আমেরিকা থেকে এসে চার বছর গ্রামের বাড়িতে ছিলাম। তখন আমাদের মসজিদে বেতনভুক্ত ইমাম। 

একদিন শবে বরাতের বিকেলে আমার এক চাচাতো ভাইয়ের ঘরে হুজুর মিলাদ পড়লেন। খুব দ্রুত তিনি মিলাদ শেষ করলেন। ৫ জি স্পিডে। মোনাজাতের পর টাকাটা নিয়ে তিনি প্রায় দৌঁড়াচ্ছিলেন। আমি ইমাম সাহেবকে ডেকে থামালাম। জিজ্ঞেস করলাম, হুজুর আপনি দৌঁড়াচ্ছেন কেন? তিনি বললেন, আরো অনেক জায়গায় মিলাদ পড়তে হবে তাই। যত মিলাদ তত টাকা।

এখন আবার ইমাম নিয়োগে ভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। তেমন বিশেষ কোনো যোগ্যতা লাগে না। বর্তমান বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনো ইসলামপন্থী গ্রুপের সমর্থক। যেমন তাবলীগ জামাত, সালাফি পন্থী বা আহলে হাদিস, রেজভিয়া গ্রুপ। যে এলাকায় যে গ্রুপ বেশি প্রভাবশালী সেই এলাকার ইমাম নিয়োগ দেওয়া হয় সেই পন্থীদের। তাবলীগ জামাত অধ্যুষিত এলাকাগুলোর মসজিদে সব তাবলীগ জামাতের ইমাম। আহলে হাদিস অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সব আহলে হাদিসের ইমাম। রেজভিয়া গ্রুপ অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে সব রিজভী গ্রুপের ইমাম। 

ইসলাম ধর্মটাকে এই গ্রুপগুলো ছেড়াবেড়া করে ফেলছে। 

Karim Chowdhury 

27 October, 2026


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

অশ্লীল নাম

বাংলাদেশের কিছু প্রতিষ্ঠান ও স্থানের বিচিত্র বা বিকৃত অর্থের নাম যা পরিবর্তন করা উচিতঃ ১. বোদা মহিলা মহাবিদ্যালয়, বোদা, পঞ্চগড় ২. চুমাচুমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাঙ্গামাটি ৩. সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খুলনা ৪. মানুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নীলফামারি ৫. সোনাকাটা ইউনিয়ন, তালতলী, বরগুনা ৬.বড়বাল ইউনিয়ন, মিঠাপুকুর, রংপুর ৭.সোনাখাড়া ইউনিয়ন, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ ৮. ধনকামড়া গ্রাম, ভোদামারা, দিনাজপুর ৯.গোয়াকাটা, দোহার, ঢাকা ১০. গোয়াতলা, ময়মনসিংহ ১১.লেংটার হাট, মতলব, চাঁদপুর

বোতল

বোতল মানব জীবনে বোতল অপরিহার্য । বোতল অনেক অর্থেও ব্যবহার হয় । কোনো কোনো এলাকায় আনস্মার্ট, বেয়াক্কেল প্রকৃতির লোককেও বোতল বলা হয় । ইউরোপ আমেরিকায় থাকতে আমি ডৃংক করতাম । হার্ড ডৃংক কমই খেতাম । প্রতিদিনই বিয়ার খেতাম । বিয়ার স্বাস্থ্য ভালো রাখে ও কাজ করতে এনার্জি জোগায় । পরিমিত বিয়ার খেলে কেউ মাতাল হয় না । মাঝে মাঝে বিশেষ কোনো পার্টিতে হুইস্কি খাওয়া হতো । তাও দামি ব্র্যান্ডের । জনি ওয়াকার ব্ল্যাক লেবেল, টিচার্স, পাসপোর্ট, হেনেসি, শিভাস রিগাল, জ্যাক ড্যানিয়েলস । সাকুরায়ও অনেক সময় এসব ব্র্যান্ডের হুইস্কি পাওয়া যায় না । তো দেশে আসার পরও কিছু দিন ডৃংক করেছিলাম । কুমিল্লায় সরকার অনুমোদিত একটা মদের দোকান আছে চক বাজারে । নামঃ নাদের ট্রেডিং কোং । এটা প্রায় আজ ৫০ বছর । এখানে বিদেশি ব্র্যান্ডের ডৃংক পাওয়া যায় না । দেশিয় কোম্পানি ‘কেরো এন্ড কোং’ যা দর্শনায় অবস্থিত তার তৈরি ভদকা, হুইস্কি, জিন পাওয়া যায় । আমাদের সমাজতো রক্ষনশীল । তাই কান্দিরপাড় থেকে একটা স্প্রাইট কিনে অর্ধেক খেতে খেতে চক বাজার যেতাম । নাদেরে যখন পৌঁছতাম তখন স্প্রাইটের বোতল অর্ধেক খালি হয়ে যেতো । আমি বাবুল ভাইকে স্প্...

আমার দেখা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ

আমার দেখা ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ সরকারঃ শেখ মুজিবের শাসনামল ১৯৭৪-এর দুর্ভিক্ষ বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালের মার্চে শুরু হয়ে সেই বছরেরই ডিসেম্বরের দিকে গিয়ে শেষ হয়। এই দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষ অনাহারে মারা গিয়েছিল। এই দুর্ভিক্ষকে স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ানক হিসেবে গন্য করা হয়। ওই সময় আমি বুঝতাম। ক্লাশ ফোরে পড়তাম। আহারে ! কি যে অভাব ! অনেকের মতো আমরাও ভাত না খেয়ে রুটি খেয়েছি । তাও পরিমিত । কখনো জাউ খেয়েছি । শুকনো মরিচ পাওয়া যেতো না । কাঁচা মরিচের কেজি ছিলো ১৫০ টাকা । লবন ১২০ টাকা । আর সোনার ভরি ছিলো তখন ১৫০ টাকা । সোনা শুধু ওই সময় কম দাম ছিলো । চারদিকে অভাব । সারাদেশের মানুষের হাহাকার । কতো মানুষ না খেয়ে মারা গেছেন ! বিদেশি রিলিফ সব আওয়ামী লীগের লোকেরা চুরি করেছে । আর বেশিরভাগ রিলিফ সীমান্ত দিয়ে ভারতে চলে পাচার হয়েছিলো । তখন বর্ডার খোলা ছিলো তখন । মহিলাদের শাড়ি কাপড় ছিলো না । অনেকে মাছ ধরার জাল পরে লজ্জাস্থান ঢেকেছিলো । এসব ছবি পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছিলো । কিন্তু আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো অভাব ছিলো না । বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র দুই বছর তিন মাসের মাথায় ...